বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০১৫

আমাদের স্বাধীনতা পরাধীনতার শৃঙ্খল মুক্ত নয়


আমরা স্বাধীন। এই কথা হৃদয়ে ধারণ করি, গর্ব অনুভব করি। কিন্তু তবুও একটা কষ্ট। মনে প্রশ্ন আসে- আমরা কি সত্যিই স্বাধীন। স্বাধীন বাংলাদেশ গান গেয়েও তো দেখি এই জনপদের অনেক মানুষ মুক্ত বাতাসে নিশ্বাস নিতে পারছে না। বলতে হয়, আমরা স্বাধীন। কিন্তু পরাধীনতা এখনো বারবার আমাদের স্বাধীনতায় ছোবল মারে।

সেদিন খুলনা যাচ্ছিলাম। কাওয়াকান্দি থেকে মাইক্রো সার্ভিসে উঠলাম। ছোট একটা গাড়ি। নয়টা সিট, কিন্তু আমরা বসলাম ১৮ জন। কিছুই করার নাই, যেতে হবে। সুতরাং তারা যেভাবে নেয় সেভাবেই যেতে হচ্ছে। কোন প্রশ্ন করা মানে বিপাকে পড়া। করলেই সোজা জানিয়ে দেবে, ‘আপনি যাবেন? গেলে যান না হয় অন্য গাড়ীতে আসেন।‘ আসহায় মনে হয় নিজেকে!
এই শ্রেনীর মানুষদের কাছে যাত্রীরা জিম্মি। একটু খোঁজার, তলিয়ে দেখার প্রয়াস পেলাম। দেখা গেল ১৮ জন থেকে ৫৫০০টাকা তারা ভাড়া নেয়। কিন্তু ড্রাইভারের হাতে দেয়া হয় ৩২০০ টাকা। বাকি টাকা? বিষয়টি সবার কাছেই দিনের আলোর ন্যায়মত স্পষ্ট। এমপি সাহেবের ভাগ, পরিচালনা কমিটি, এলাকার বড় ভাই সবাইকে এখান থেকে একটা অংশ দিতে হবে। একই ভাবে গত ঈদের আগের দিন স্পিড বোটে করে যাচ্ছিলাম। সব সময় ভাড়া নেয় ১৫০, সেদিন নিল ২৫০ টাকা। বোটের চালককে জিজ্ঞেস করলাম, ১০০ টাকা যে বেশী সেটা কি তোমরা পাবে? তার উত্তর, ‘না ভাই আমরা যা পেতাম তাই পাব। বাকিটা মন্ত্রী, এমপি, ঘাটের খরচ।‘
বলছিলাম খুলনা যাওয়ার সময়ের কথা। মাইক্রোতে বেশী লোক বসায় এক জনের পায়ের সাথে অন্য জনের পা লাগছিল। সবাই স্বাভাবিক ভাবেই মেনে নিচ্ছিল। শুরু হল কথা। একজন সিরিয়ার কথা তুললেন। বললেন, ‘সেখানে মানুষদের জীবন যাপন নিয়ে। বাশার আল আসাদ অনেক দিন থেকে সে দেশের প্রেসিডেন্ট। মানুষের স্বাধীনতা বলতে গেলে নাই-ই। জোর যার মুল্লুক তার। এভাবেই চলছে তাদের সব কিছু, প্রত্যেক নাগরিকের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে যা বরাদ্দ তা দিয়েই চলতে হয়। এমনকি পানি পর্যন্ত সরকারের নিকট থেকে বরাদ্দ।‘
আমি জানতে চাইলাম, ভাই তারা টিউবওয়েল বসায় না কেন? লোকটির উত্তর, ‘মাটি খোঁড়াও নিষিদ্ধ! টিউবওয়েল বসানোর তো প্রশ্নই আসেনা।‘
‘পুরুষ মানুষের বয়স ১৮ এর বেশী হলে অধিকাংশকে হত্যা করা হয়, কারণ তারা সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারে। মানুষকে সংঘবদ্ধ করতে পারে। এজন্য সেখানে পুরুষরা যারা বেঁচে থাকে তারা কোন কাজ করে না। বাইরে বের হলে গুলির মুখে পড়তে হতে পারে, তাই ক্ষেত-খামারের কাজ থেকে শুরু করে সব কাজ মহিলারাই করে। আইন-আদালত বলতে গেলে নাই। যাকে ভাল লাগছেনা গুলি করে হত্যা করছে। দেশ কয়েক  ভাগে বিভক্ত। এক পক্ষ সরকার, এক পক্ষ সেনাবাহিনী, এক পক্ষ বিরোধী দল। যে যার মত করে চলছে। কাউকে ভাল না লাগলে গুলি করে হত্যা করছে। সখানে সবার কাছে অ¯্র থাকা বৈধ। সুতরাং কোন ঘটনা ঘটলে অস্ত্র নিয়েই সবাই বের হয়। কোন বিচার ব্যবস্থা সেভাবে নেই।‘
যার কাছ থেকে শুনছিলাম তিনি মিশনে গিয়েছেন কয়েকবার। সিরিয়ায় তার বেশ কিছুদিন থাকার সুযোগ হয়েছে। সিরিয়ার এ অবস্থার কথা যখন ভাবি, তখন মনে হয় আমরা বেশ স্বাধীন আছি। এখনো আমাদের পুরুষরা বের হয়ে কাজ করতে যেতে পারে। হয়তো বিরোধী দল ঢাকা শহরে প্রকাশ্যে মিছিল মিটিং করতে পারছেনা। কিন্তু তাতে কি! আমরা তো বাজারে যাই, কাজ করি। হয়তো সংবাদপত্র সম্পাদক, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার চেয়ারম্যানদের ডেকে সরকারের পক্ষে থাকার জন্য হয়তো হুমকি দেয়া হচ্ছে, হয়তো সঠিক কথা না বলতে সুশীল সমাজকে নিষেধ করা হচ্ছে, হয়তো গ্রহনযোগ্য নির্বাচন না হলেও ক্ষমতা ছেড়ে পুনরায় নির্বাচন দিতে অস্বীকৃতি জানানো হচ্ছে, হয়তো পুলিশ-র‌্যাব-বিজিবির কর্তা ব্যাক্তিদের পছন্দ মত নিয়োগ দিয়ে বিরোধী দল দমনে সরকার তাদের ওয়াদা করিয়ে নিচ্ছে, হয়তো রাষ্ট্রীয় বাহিনী কাউকে হত্যা, কাউকে গুম, কাউকে গ্রেপ্তার করে কারান্তরীন করছে; কিন্তু তারপরও আমরা যে এখনো টিউবওয়েল বসিয়ে পানি তুলে খেতে পারছি! রাস্তায় ভয় নিয়ে হলেও চলতে পারছি। সেটাই বা কম কীসে?
বাংলা একাডেমি প্রকাশিত অভিধানে স্বাধীন শব্দের অর্থ দেয়া আছে- ১.বাধাহীন; আজাদ; মুক্ত; স্বচ্ছন্দ(স্বাধীন গতি) ২.নিজের বশে; অনন্যনির্ভর (স্বাধীন মতামত) ৩.সার্বভৌম; বিদেশী দ্বারা শসিত নয় এমন।
বর্তমান বাংলাদেশের পরিস্থিতির সাথে “স্বাধীন - স্বাধীনতা” শব্দের অর্থের কোন মিল আছে বলে আমার মনে হয় না। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন আসে, কেন এই পরিস্থিতি? আমরা কেন পরনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছিনা? ক্ষমতায় থাকার জন্য জনগণের চেয়ে কেন অন্য রাষ্টের নেতৃত্বকে বেশী গুরুত্ব দিতে হবে? কেনইবা অবৈধ নির্বাচনের বৈধতার সমর্থন পাওয়ার জন্য নিজের দেশের স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে অন্যদের সুযোগ করে দিতে হবে? এসব বিষয় সন্দেহাতীতভাবে আলোচনার দাবি রাখে।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মুসলামানরা বড় একটা সময় পৃথিবী শাসন করেছে। ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বশেষ মুসলিম শাসক ছিলেন নবাব সিরাজ-উদ্দৌলা। সেই ১৭৫৭ সালের কথা। লর্ড ক্লাইভদের কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা পাওয়ার জন্য মুসলিম শাসকদের ভেতরে থাকা বৃটিশদের চর ঘসেটি বেগম, মীরজাফররা সেদিন বৃটিশদের ক্ষমতা দখলের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। পরাজিত হয়ে ইতিহাস থেকে প্রায় মুছে গিয়েছিল মুসলিম শাসন আমল। কিন্তু মুসলমানরা অপ্রতিরুদ্ধ জাতি, পরাজয় তারা কখনো মেনে নিতে পারে না। আল্লাহর ওপর ভরসা করে তারা সব সময় এগিয়ে গিয়েছে। যদিও প্রায় দুইশত বছর আমাদেরকে ইংরেজদের কাছে পরাধীন থাকতে হয়েছে। কিন্তু অব্যাহত প্রতিরোধ ও বিরোধীতায় হতাশাগ্রস্থ হয়ে এক সময় তারা নিজেদের বাঁচানোর জন্য হিন্দুদের হাতে ক্ষমতা দিয়ে দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করে। কিন্তু এর আগেই মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী  দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন। পরবর্তীতে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সাথে বিষয়টি শেয়ার করেন। তখন মুসলমানদের প্রতিবাদের মুখে তারা শুধুমাত্র হিন্দুদের হাতে ক্ষমতা দিয়ে পালাতে সক্ষম হয়নি। গড়ে ওঠে হিন্দু জনপদ নিয়ে হিন্দুস্থান ভারত। আর মুসলমান জনপদ নিয়ে মুসলমানদের কল্যাণ রাষ্ট্র পাকিস্তান । কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য আমরা যারা পূর্ব পাকিস্থানের অধিবাসী ছিলাম, স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্রে থেকেও অনেকটা পরাধীনের মতই ছিলাম। শারমিন আহমেদ ‘নেতা ও পিতা‘ বইয়ে লিখেছেন, ‘স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার জন্য ২২মার্চ ১৯৭১ আওয়ামীলীগ নেতা জনাব শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে জনাব তাজউদ্দিন আহমেদ লিখে নিয়ে গিয়ে বলেছিলেন আপনি স্বাক্ষর করে দিন। তিনি তখন বলেছিলেন তুমি কি আমাকে দেশদ্রোহী বানাতে চাও? এখানে স্বাক্ষর করা মানে তারা আমাকে রাষ্ট্র দ্রোহী মামলা দিয়ে জেলে নিবে। হতাশ হয়ে তাজ উদ্দিন ফিরে এলেন।’
২৫ মার্চ কালো রাতে শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হন এবং বাংলার মানুষের উপর পাকিস্থানি হানাদার বাহিনীর অতর্কিত হামলা শুরু হয়। ২৬ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। যুদ্ধ শূরু হয়।
১৭ এপ্রিল অধ্যাপক ইউসুফ আলী স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন এবং মুজিবনগর সরকারের কাঠামো গঠিত হয়ে পূর্নাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হয়। মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বে মুক্তি বাহিনী, ভারতের সরাসরি তত্ত্বাবধানে মুজিব বাহিনী এবং কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে কাদেরিয়া বাহিনী যুদ্ধ করে। সেটি ভিন্ন আলোচনা।
দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ চলার পর ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বিকাল ৪.৩১ মিনিটে জেনারেল আমীর আব্দুল্লাহ খান নিয়াজীর নেতৃত্বে পাকিস্তানী বাহিনী ল্যাফটেনেন্ট জেনারেল জগজিৎ সিং আরোরার কাছে আত্মসমর্পন করে। গঠিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ। কিন্তু তখনই ভারতের কাছে যে আমাদের পরাধীন থাকতে হবে সেটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ক’দিন আগেও ভারত মওকা মওকা ভিডিও তৈরি করেছে। সেখানে তারা বুঝাতে চেয়েছে তারা বাংলাদেশকে আমাদের দান করেছে! যুদ্ধের পর ভারতীয় বাহিনী প্রায় এক সপ্তাহ পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরের গুরুত্বপূর্ন সব সম্পদ নিয়ে যায়। আমাদের দেশকে পরিণত করে তলাবিহীন ঝুড়িতে। আমাদের দেশ পরিণত হয় তাদের বাজারে।
আমাদের দেশীয় প্রতিনিধির হাতে শাসন ক্ষমতা এলেও মূলত ইংরেজ শাসন আমল থেকে শুরু করে স্বাধীনতার নামে আমাদের গোলামী ও পরাধীনতার হাত বদল হয়েছে মাত্র! বর্তমানে আমরা স্বাধীন হয়েও আধিপত্যবাদী ভারতের ছোবলের শিকার হচ্ছি।
পাকিস্তানিদের হাত থেকে স্বাধীনতা অর্জন যেমন গৌরবের, তেমনি ভারতের আধিপত্যবাদের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হওয়াও অনেকটা লজ্জার। যা বর্তমান প্রজন্ম এখন কিছুটা বুঝতে শুরু করেছে। 
এই আধিপত্যবাদের হাত থেকে আমাদের মুক্ত হতে হবে। আমাদের প্রয়োজন গনতন্ত্রের সঠিক চর্চা। প্রয়োজন বিরোধী মতের যথাযথ মূল্যায়ন। প্রয়োজন সাহসী পদক্ষেপের, সৎ দক্ষ্য ও দেশপ্রেমিক নেতৃত্বে। প্রয়োজন জনগণের অংশগ্রহনমূলক সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের।

লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক


ছাত্ররাজনীতিঃ লেজুড়বৃত্তিতে বাড়ছে অবক্ষয় -২য় পর্ব




গত ডিসেম্বর২০১৪ সংখ্যায় যেখানে শেষ করেছিলাম দুটি লাইন উল্লেখ করেই আজকের অংশটি তুলে ধরার চেষ্টা করছি ।
‘একজন সচেতন মানুষ কখনোই একটি টেপ রেকর্ডারের মত নয়। একটি টেপ রেকর্ডার যে কোন কিছু ধারণ করে হুবহু তা তুলে ধরে। সচেতন যে কোন মন কোনকিছু শোনার পর তা যাচাই করে নেয়। নিজের বিবেচনা বোধকে কাজে লাগিয়ে কোন কাজে যুক্ত হয়। কিন্তু ছাত্র রাজনীতির সাথে আজ যারা যুক্ত, তাদের মাঝে এ বিবেচনা বোধ আছে কি?’
ছাত্র রাজনীতিকে সঠিক পথে ফেরানোর দায়িত্ব আমাদেরই। আর এজন্য আমাদের এই রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা থেকে শুরু করে নানা বিষয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন।

ছাত্র রাজনীতি কেন প্রয়োজন?
যদিও নিকট অতীতে বাংলাদেশে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবি তুলেছেন অনেকেই, কিন্তু প্রায় শতভাগ মানুষই এই রাজনীতির প্রয়োজনীয়তাকে স্বীকার করে নেন। ছাত্র রাজনীতি যেমন ছাত্র সমাজের জন্য প্রয়োজন, তেমনিভাবে দেশের উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ চিন্তাকে সামনে রাখলেও এ রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা পরিস্কার হয়ে যায়।
ক.ছাত্রসমাজের সমস্যা সমাধানে ভূমিকা পালন
আজ যারা বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বা মাদরাসায় পড়ছে, তারা প্রতিনিয়তই নানা ধরণের সমস্যা মোকাবেলা করে পথ চলছে। ছাত্র সমাজের যে কোন সমস্যাকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে ও তা সমাধানের লক্ষে পৌছানোর জন্যই ছাত্র রাজনীতি প্রয়োজন। ধরুন, একটি কলেজে কোন ধরণের রাজনীতি নেই। সেই কলেজে হাজারো সমস্যা রয়েছে। খেয়াল করলে দেখা যাবে সেই কলেজের এসব সমস্যাকে তুলে ধরে প্রতিকারের দাবি নিয়ে উচ্চবাচ্য করার মত তেমনভাবে কেউ এগিয়ে আসছে না। ছাত্রদের আবাসন, শিক্ষার পরিবেশ, সামর্থের আলোকে বেতনাদি নির্ধারণ, এসব বিষয় নিয়ে ছাত্রদেরই তো সর্বোচ্চ সচেষ্ট থাকতে হবে। আর সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার বিষয়টিই ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজনকে স্পষ্ট করে।

খ.শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে সহযোগিতা
অবক্ষয়ের ফলে আজ ছাত্র রাজনীতি যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, সেখান থেকে অনেকেই শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকার পেছনে এই রাজনীতিকেই দেখতে পান। কিন্তু প্রশ্ন হলো- ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করে দেয়াই কি এর সমাধান। নাকি ছাত্র রাজনীতিকে সঠিক পথে ফেরানো? মূলত, শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশের জন্যই ছাত্র রাজনীতি প্রয়োজন। রাজনীতি হলো একটি প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যোগ্য ব্যক্তিরা সামনের সারিতে চলে আসেন। তারাই সমাজ ও দেশ গঠনে ভূমিকা রাখেন। ছাত্র রাজনীতির ক্ষেত্রেও তেমনি। যোগ্য ছাত্ররা নেতৃত্বে আসে ও শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতে সচেষ্ট থাকে। ছাত্র রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়নের ফলে আজ অনেক ছাত্র নামধারী সন্ত্রাসীকে সামনের সারিতে দেখতে পাই। কিন্তু একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায়, যোগ্য ছাত্র কোন শিক্ষাঙ্গনে নেতৃত্বে থাকলে সে অনেক ছাত্রকে ভবিষ্যতের দিক নির্দেশনা দিতে পারে। ছাত্রদের মেধার বিকাশে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসসহ নানা সমস্যার থাবা থেকে রক্ষা করতে পারে। ফলে শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার চমৎকার পরিবেশ বিরাজ করে।  
গ.গনতন্ত্র চর্চার শিক্ষা ক্ষেত্র
গণতন্ত্র এখনো পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনায় গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত। এই পদ্ধতি শুধু রাষ্ট্রের জন্যই যে প্রয়োজন, তা নয়। রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গ, রাষ্ট্রের ভেতরের নানা পর্যায়ে এর চর্চার প্রয়োজন রয়েছে। ছাত্র রাজনীতি একজন ছাত্রকে গণতন্ত্র মনস্ক করে তোলে। গণতন্ত্রের পথ ধরে কীভাবে চলতে হয়, তা-ই শিক্ষা দেয়। আজ যখন আমাদের জাতীয় রাজনীতির পর্যালোচনা হয়, তখন বোদ্ধারা ঠিকই বলেন, রাজনীতির পথ বেয়ে উঠে আসা নেতা জাতীয় রাজনীতিতে কমে যাচ্ছে। ফলে অবক্ষয় বাড়ছে। যে ছেলেটি ছাত্র রাজনীতি করেছে, পরবর্তীতে জাতীয় রাজনীতিতে ভূমিকা রাখছে, সে স্বাভাবিকভাবেই তার দেশ ও দেশের সমস্যা-সম্ভাবনাকে ভালোভাবে অনুধাবন করবে। কিন্তু এ ধরণের মানুষের অভাবের কথাই বোদ্ধারা বলে থাকেন। আমরা নিশ্চিত করেই বলতে পারি, গণতন্ত্রের প্রথম ধাপের সবকটি দেয় ছাত্র রাজনীতি। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজে যদি ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়, তাহলে তা দেশের সার্বিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই আরো শক্তিশালী করবে।
ঘ.সমসাময়িক সংকটে ভূমিকা পালন
রাজপথের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয় ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িতরাই। এটাকে খারাপ হিসেবে দেখার কোন কারণ নেই। দেশে যে কোন সংকট তৈরি হলে ছাত্র রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্টরা হয়তো টেবিল আলোচনায় সমাধানের পথ দেখান না, কিন্তু যে কোন অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে রাজপথে তারা সংগ্রাম করেন। অতীতে ছাত্র রাজনীতি কীভাবে সংকট মোকাবেলায় ভূমিকা রেখেছে, ইতোপূর্বে তা আলোচনা করা হয়েছে। দেশের চলমান সংকটেও ছাত্র রাজনীতি বড় ভূমিকা রাখছে। অপশাসন বিরোধী সংগ্রামে ছাত্রশিবিরের নেতৃত্বে ছাত্রজনতা রাজপথে সংগ্রাম চালিয়েই যাচ্ছে।
ঙ.আগামী নেতৃত্ব তৈরি
এই প্রয়োজনটি সকলেই ভালোভাবে অনুধাবন করেন। ছাত্র রাজনীতি করার মাধ্যমেই একজন ছাত্র নেতৃত্ব কী, জনগণের প্রত্যাশা কী, কীভাবে জনপ্রত্যাশা পূরণে ভূমিকা রাখতে হয়, তা শিখতে পারেন। এসব শেখার মধ্য দিয়েই রাজনীতি সংশ্লিষ্ট ছাত্রটির মাঝে জাতীয় নেতৃত্ব দেয়ার সক্ষমতা তৈরি হয়। কোন ব্যক্তি হঠাৎ করেই নেতা হয়ে যান না। কিংবা কেউ নেতা হয়েই জন্ম নেন না। নেতা হিসেবে আবির্ভূত হবার আগে অনেক চড়াই-উৎরাই পেরুতে হয়। ছাত্র রাজনীতি একজন ছাত্রকে তার গুনাবলি বিকশিত করার মাধ্যমে আগামী দিনের কারিগর হিসেবে তৈরি করে। কাজেই, দেশ ও জাতির প্রয়োজনে দেশে ছাত্র রাজনীতি অব্যাহত থাকা জরুরী।

কারা ছাত্র রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হয়

দুঃখজনক হলেও সত্য, এখন জনমনে একটা ধারণা জন্মেছে যে ভালো ছেলেরা রাজনীতির সাথে যুক্ত হয় না। বাস্তবতা হলো, ছাত্র রাজনীতি কলুষযুক্ত হওয়ায় ভালো অনেকে চাইলেও কলুষমুক্ত থাকতে পারছে না। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত বা নি¤œবিত্ত- সব ধরণের পরিবার থেকেই একটা সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী রাজনীতিতে যুক্ত হন। একেক ধরণের অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে এসে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া ছাত্র-ছাত্রীদের চিন্তা ও কাজে পার্থক্য থাকে। একটু আলোকপাতের চেষ্টা করছি।
উচ্চবিত্ত: স্বাভাবিক ভাবে উচ্চবিত্ত পরিবারের ছাত্র-ছাত্রীদের খুব বেশী রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হতে দেখা যায় না। যারা রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান তারা পারিবারিক ঐতিহ্যের প্রয়োজনে রাজনীতি করে। আর একটি অংশ করে শখের বশে। যেহেতু উচ্চবিত্ত হওয়ায় সম্পদের কোন অভাব নেই, তাই অর্থব্যয়ের একটা মাধ্যম হিসেবেও অনেকে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়। উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা ছাত্র রাজনীতিতে এলে অবশ্য কম সময়ে নেতৃত্বে চলে আসারও সুযোগ পায়।
 মধ্যবিত্ত: মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা স্বাভাবিকভাবেই আর দশজনের মাঝে একটু মর্যাদার আসনে থাকার স্বপ্ন দেখে। একইভাবে স্বপ্ন দেখে অর্থশালী হওয়ার। আর এ কারণেই অনেকে রাজনীতিকে পাখির চোখ করে। দেখা যায়, মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেমেয়েরাই রাজনীতিতে বেশী সক্রিয়। নিজেকে চূড়ান্ত উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য তারা যে কোন বড় ভাইয়ের হাত ধরে শুরু করে। বড় ভাইয়ের সকল চাহিদা পূরণেও তারা সচেষ্ট থাকে। এ ক্ষেত্রে অনেকেই কোনটা নৈতিক কোনটা অনৈতিক সেটা বিবেচনায় নেয় না। কলুষযুক্ত ছাত্র নেতারা এর সুযোগ নেন। নতুন রাজনীতিতে আসা ছেলেমেয়েদের নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেন। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ বিভিন্ন অপকর্মেও এই ছেলেমেয়েদের ব্যবহার করা হয়। কমিটি গঠনকে সামনে রেখে কাউকে পোস্ট দেয়ার মুলো ঝুলিয়ে নানান অপকর্ম করিয়ে নেয়া হয়। এক সময়ে মধ্যবিত্ত ঘরের কেউ কেউ নেতা হবার সুযোগও পেয়ে যায়, কিন্তু তাদের নৈতিকতা বোধ ততদিনে চুলোয় ওঠে। দুঃখ হলো, যে নেতৃত্বের বেড়ে ওঠাই এভাবে, সেই নেতৃত্ব থেকে দেশ-জাতি খুব বেশী কী-ইবা  আশা করতে পারে?
ঠেকায় পড়ে রাজনীতি: বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর হলে উঠতে হলে মোটামুটি কোন না কোন বড় ভাইয়ের হাত ধরেই উঠতে হয়। আর কেউ যদি নিজে নিজেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে হলে উঠে, তাহলে তাকে প্রথম অথবা দ্বিতীয় রাতেই র‌্যাগের শিকার হতে হয়। এই র‌্যাগ সম্পর্কে আপনাদের সবার জানা আছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে এক নতুন ছাত্রকে র‌্যাগ দেয়ার একটি ঘটনা উল্লেখ করছি। হলে নতুন ওঠা এক ছেলেকে প্রথম রাতেই ৬/৭জন বড় ভাই তাদের রুমে নিয়ে বিভিন্ন ভাবে নাজেহাল করতে থাকে। ছেলেটিকে মদ পান করিয়ে এবনরমাল করে ফেলে। পরে তার সাথে সবাই একের পর এক জোর করে সমকামিতায় লিপ্ত হয়। ছেলেটি বুঝতে পারেনা কী করবে। সকাল বেলায় তার অচেতন দেহ পড়ে থাকতে দেখে হল কতৃপক্ষ। ছেলেটি বেঁচে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু চট্টগ্রাম মেডিকেলে তার আর পড়ালেখা হয়ে উঠেনি। এ রকম বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার হয়ে বাধ্য হয়ে বড় ভাইদের গ্রুফের সদস্য হতে হয়। কাউকে আবার নির্যাতন না করে ধমক দিয়েই গ্রুফের মেম্বার করে নেয়। শুরু  হয় বড় ভাইদের কথা অনুযায়ী  নিয়মিত মিছিল মিটিংয়ে যাওয়া। এক পর্যায়ে কেউ কেউ ভাল ভাবেই শুরু করে, কেউ ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পড়ে। আবার কেউ নেতৃত্বে চলে যায়।
মূলত লেজুড়বৃত্তির কারণেই ছাত্রদের মাঝে আলাদা আলাদা গ্রুপ হয়ে যায়। নিজেকে সবাই তুলে ধরার চেষ্টা করে। আর তুলে ধরতে গিয়েই আতংক ছড়ানোর প্রয়োজন হয়। এটা অবশ্যই অস্ত্র ব্যতিত হয় না। অস্ত্রের ব্যবহার এখন রাজনীতির জন্য অনেকটা ডাল-ভাত হয়ে গিয়েছে। গত নভেম্বর মাসে এক সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রলীগ সভাপতি স্বীকার করে নিয়েছেন যে তারা অস্ত্র ব্যবহার করেন। তিনি সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন যে, আগের থেকে অস্ত্রের পরিমান কমানো হয়েছে। এর দ¦ারা বুঝা যায় পূর্বে আরো বেশী অস্ত্রের ব্যবহার ছিল। আর বিভিন্ন মিছিল সমাবেশে প্রকাশ্যে অস্ত্র ব্যবহার, বিভিন্ন সময়ে মিডিয়াতে ফলাও করে প্রকাশ এবং নিজেদের স্বীকারোক্তির পরও প্রশাসন তাদের গ্রেপ্তার করে না কারণ এ সকল ছাত্রনেতাদের তারা সরকারের অংশ মনে করে। ছাত্রনেতাদের কথায় অনেক সময় তাদের চাকরী, বদলি, প্রমোশন সুপারিশ এগুলো নির্ভর করে, সুতরাং ইচ্ছা করেই এমপি-মন্ত্রীর রোষানলে পড়ার কী দরকার? যখন যে দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকে তখন তাদের অস্ত্র ব্যবহার জায়েজ হয়ে যায়।
এছাড়া আদর্শিক কারনেও অনেকে ছাত্ররাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হয়ে থাকে ।
                                                                                                         ...................  চলবে








                

প্রথম পর্বের লিংকঃ  http://monirahmedbd.blogspot.com/2014/12/blog-post.html

http://chhatrasangbadbd.com/%E0%A6%9B%E0%A6%BE%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A6%A8%E0%A7%80%E0%A6%A4%E0%A6%BF-%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%9C%E0%A7%81%E0%A7%9C%E0%A6%AC%E0%A7%83%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%A4/

বুধবার, ৪ মার্চ, ২০১৫

একজন শামীমের বাবা ও জনগণের অধিকার : মনির আহমেদ


শামীম (ছদ্মনাম), বয়স তখন সাত-আট বছর। গ্রামের স্বাভাবিক নিয়ম মেনে প্রতিদিন সকালে মক্তবে যেত সে। মক্তব থেকে ফিরে স্কুলে। একদিনের ঘটনা। সেদিনও সে মক্তবে গিয়েছিল। কিন্তু মক্তব থেকে ফিরে স্কুলে যেতে পারলো না। পাড়ার সব ছেলে-মেয়ে স্কুলের দিকে রওনা দিলেও তার যাওয়ার উপায় নেই। কারণ তার বাবা অসুস্থ্য।
শামীম বুঝতে পারে তার বাবার অবস্থা বেশ খারাপ। ছোট্ট সে শুধু কাঁদতে থাকে।
বাবার কী হয়েছে? অনেক চিন্তা শামীমের মাথায় জটলা পাকায়। এ সময় চাচা-জ্যাঠাদের গর্জন শুনতে পায় সে। তারা বলাবলি করছে, আমাদের ডাকলিনা কেন? ‘কত বড় সাহস আমাদের বাড়ির সামনে এসে আমাদের ভাইকে এভাবে মেরে যাবে? এটা কোন ভাবেই মেনে নেয়া যায় না।’
শামীম বুঝতে পারে কেউ তার বাবাকে মেরে আহত করেছে। খানিক পরেই সে মূল ঘটনা বুঝতে পারে।
শামীমদের বাড়ির পাশে ১২ শতকের একটি ভিটা আছে। তাদের গ্রামে বাড়ির পাশের উঁচু জমিকে ভিটা বলে। কিছু দিন থেকে এই ভিটা নিয়ে প্রায় সময় বাড়িতে তার বাবা বাসায় আম্মার সাথে কথা বলে। চাচা-জেঠাদের সাথেও বেশ ক’বার কথা বলেছে। এই ভিটা নিয়েই গ-গোল।
শামীমের দাদা অনেক সম্পত্তির মালিক ছিল। বিভিন্ন সময় জমি বিক্রি করেছে মানুষের কাছে। কারো কাছ থেকে টাকা নিয়েছে অথবা কাউকে এমনিতেই দলিল করে দিয়েছে। তার দাদা মানুষ হিসেবে অনেক উদার ছিল। সাধারন মানুষের কষ্ট একেবারেই সহ্য করতে পারত না। তাই সে মানুষের জন্য সাধ্যমত করতো। আর এই সুযোগ কিছু সুবিধাভোগী মানুষ কাজে লাগায়। কেউ হয়তো ১০ শতক নিয়েছে, কিন্তু ১৫ শতক ব্যবহার করা শুরু করতো। দাদার সরলতার সুযোগে এ কাজটি অনেকেই করেছে। পরবর্তীতে তার ছেলে মেয়েরা যখন বড় হয়েছে, বিয়ে করেছে, তাদেরও সন্তানাদি হয়েছে; তখন জমির গুরুত্ব তাদের কাছে স্বাভাবিক ভাবে বাড়তে শুরু করেছে।
শামীমের বাবা ইতিমধ্যে বের করেছে যে ভিটাটি তাদের। তখন তার বাবা ভিটার মালিক ও গ্রামের মুরুব্বিদের সাথে এ বিষয়ে কথা বলে। মালিক পক্ষও ভিটা ফিরিয়ে দিতে রাজি হয় এবং বলে যে, ঠিক আছে আপনারা দখল নেন।
ঘটনার দিন সকাল বেলা শামীমের বাবা জমিটি দখলে নেয়। হাল চাষও শুরু করে। কিন্তু এর মধ্যে একজন ঝামেলা পাকায়। সে এতদিন যে ভিটাটি ভোগ করেছে, তাকে গিয়ে কুবুদ্ধি দেয়। সে বলে, কেন শামীমের বাবা এতদিন পরে ভিটাটি দখল করবে? শামীমের বাবাকে ভিটা দখলে নেয়া থেকে বিরত রাখতে সে পরামর্শ দেয়।
 কুবুদ্ধি ধরেই এতদিনের অবৈধ ভোগকারী লোকবল নিয়ে ওঁৎ পেতে থাকে। শামীমের বাবা যখন ভিটায় হাল চাষ করতে যায়, তখন তার ওপর হামলে পড়ে। ফলে শামীমের বাবা গুরুতর আহত হয়। তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় । 
ঘটনাটি এখানেই থেমে থাকে না। শামীমের বাবার বিরুদ্ধে সেদিনই মামলা করা হয়। দুপুর নাগাদ শামীমদের বাড়ীতে পুলিশ আসে। মামলাকারী প্রভাবশালী। তার বাপ-দাদারা দরিদ্র ছিল, কিন্তু সে নানাভাবে অর্থশালী হয়ে উঠেছে। কাজেই পুলিশ এসেছে। পুলিশের উপস্থিতি শামীমদের গ্রামে স্বাভাবিক নয়। পুলিশের খবর পেয়ে গ্রামের অনেক মানুষেরা জটলা পাকায়। সবার মাঝে এক ধরণের আতঙ্ক। পুলিশেরা শামীমের বাবার নাম করে গালাগালি করতে থাকে, জানান দেয় যে কাকে খুঁজতে এসেছে। শামীম হঠাৎ পুলিশকে জিজ্ঞেস করে বসে, আমার বাবাকে তোমাদের কী দরকার? শুনেই এক পুলিশ বন্দুকের নল দিয়ে শামীমের মাথায় মারে।
মুহুর্তেই গ্রামের মানুষেরা ভয়ে শামীমদের বাড়ি থেকে চলে যায়। এই অবস্থা শুনে হাসপাতাল থেকে শামীমের অসুস্থ্য বাবাই বাড়ীতে চলে আসে। বাড়ির লোককে শান্ত থাকতে বলে।
পরবর্তীতে শামীমের বাবাকেও বাড়ির লোকেরা মামলা করার পরামর্শ দেয়। ফলে মামলা দায়ের হয়। শুরু হয় মামলা পাল্টা মামলার খেলা। এই ভাবে চলে তিন বছর।
পরে মামলার রায় শামীমের বাবার পক্ষেই আসে। বিরোধী পক্ষ উচ্চ আদালতে আপিল করায় রায় স্থগিতও হয়।তারা যখন বুঝতে পারে যে মামলা চালিয়ে তাদের লাভ হওয়ার সম্ভাবনা নেই, তখন তাদের পক্ষ থেকে শামীমের বাবার কাছে প্রস্তাব আসে, তারা আর মামলা চালাতে চায় না। গ্রামেই বিষয়টি সমাধান করতে চায়। শামীমের বাবা তা মেনে নেয়। গ্রামে সালিশ বসে। শামীমের বাবা ভিটা পান। পাশাপাশি মামলার পুরো খরচ। তাকে অসম্মান ও এতদিন অন্যায় ভাবে জমিন ভোগ করার জন্য জরিমানা স্বরুপ ভিটা ভোগকারী চার শতক অতিরিক্ত জমিন রেজিষ্ট্রি করে দেয়।
এবারে আসি দেশের প্রসঙ্গে। বাংলাদেশের সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংযুক্ত হয় ১৯৯৬ সালে। তত্ত্বাবধায়কের অধীনে পরপর তিনটি নির্বাচনও হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় এসে সংবিধান পরিবর্তন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করে। কিন্তু জনগণ বারবার তত্ত্বাবধায়কের পক্ষেই দাবি তোলে। কিন্তু আওয়ামীলীগ জনগণ বা কোন রাজনৈতিক দলের কথায় কর্ণপাত করে না। ৫ জানুয়ারি ২০১৪ শেখ হাসিনার সরকারের অধীনেই ভোটার বিহীন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বলা বাহুল্য, ৫% এর বেশি ভোটার উপস্থিত ছিল না। যদিও সরকার হিসাব দিয়েছে ৪০% ভোটের। অনেকে সংলাপের বিষয়ে তখন বললেও আওয়ামীলীগের বক্তব্য ছিল- আগে নির্বাচন হয়ে যাক, এরপর সংলাপ করে আবার নির্বাচন দেয়া যাবে। 
পরবর্তীতে বিরোধী দল ও জনগণ দেখলো আসলে আওয়মীলীগ ভোটের আগে সংলাপের বিষয়ে বললেও সরকার গঠনের পর তারা এই বিষয়ে আর কথা বলতে রাজি নয়। অগত্যা দাবি আদায়ে এলো বিক্ষোভ সমাবেশ, হরতাল কর্মসূচী। এসবের পরও আওয়ামী সরকার কর্ণপাত করলো না। এবারে মাঠের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে অবৈধ সরকারের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে শন্তিপূর্ণ সমাবেশের আহ্বান করা হলো। এই সমাবেশ থেকেই সরকার পতনের জন্য চুড়ান্ত আন্দোলন ঘোষণার কথা ছিল। কিন্তু সরকার সমাবেশ হতে না দেয়ায় দেশে তীব্র সঙ্কট দেখা দিল। অবরুদ্ধ হলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। লাগাতার অবরোধ চলতে থাকলো। দফায় দফায় হরতালও।
সরকার শুরু করলো গ্রপ্তার, নির্যাতন, ক্রসফায়ার। একদিকে হরতাল-অবরোধে দুষ্কৃতিকারীদের পেট্রোলবোমা, অন্যদিকে সরকারী বাহিনীর ক্রসফায়ার।
কারা মরছে? সাধারণ মানুষ। এই পর্যন্ত চলমান সঙ্কটে প্রায় শতাধিক মানুষের জীবন দিতে হলো। হাজারো গ্রেপ্তার, গুরুতর আহত শতাধিক মানুষ। বর্তমানে রাস্তায় মানুষ প্রতিবাদ করতে পারছেনা। রাস্তায় নামলেই পুলিশের গুলি। সরকারের কর্তাব্যক্তি আর প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদের কথায় কোন তফাৎই নেই।  সবাই একই সুরে রাজনৈতিক ভাষায় কথা বলছে।
প্রতিদিনই কোন না কোন মানুষের গাড়ি আগুনে জ্বলছে, কেউ না কেউ সন্তান, স্বামী হারাচ্ছে, ব্যবসা-বানিজ্যে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। মন্ত্রী-এমপিদের কেউ বলছেন দেশে কোন অস্থিরতা নেই, আবার কেউ বলছেন দেশে অচলাবস্থা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বারবার আহ্বান জানাচ্ছেন শান্তিপূর্ন সমাধানের। কোন কিছুতেই কাজ হচ্ছে না।
এই যখন অবস্থা, তখন প্রতিবাদ জানাতে গুলশানে এসেছেন গাজীপুরের দেলোয়ার হোসেন নূর। তার কাছে কোন লাঠি, অস্ত্র বা নাশকতা চালানোর মত কিছু ছিল না। তাকে গ্রেপ্তার করা হলো। প্রতিদিনই কোন না কোন সরকার সমর্থক গোষ্ঠি মানব বন্ধন, মিছিল অথবা খালেদা জিয়ার বাড়ি ঘেরাও করতে আসছে। এসবে কোন সমস্যাও নেই। অন্যদিকে নূর হোসেন একা প্রতিবাদ জানাতে এসেছে, এটাই সমস্যা! মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের পক্ষে শক্ত ভূমিকা পালনকারী বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী মতিঝিলে অনশন করছেন অবরোধ তুলে নেয়া এবং সংলাপ-সমঝোতার জন্য, তিনিও একদিন নামায পড়ে এসে দেখেন তার বিছানাপত্র নেই। তিনি প্রশ্ন রেখেছিলেন, বিছানা-পত্র গুলো না নিলে কি হতো না? পরবর্তিতে কোন এক অশুভ ইশারায় তার কোন খবর এখন পত্রিকার পাতায় বা অন্যান্য গণমাধ্যমে দেখা যায় না।
রাস্তায় দাঁড়িয়ে যখন প্রতিবাদ করলে গ্রেপ্তার আর পুলিশের গুলি, ঠিক তখনই কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের অধিবাসী জালাল উদ্দিন মজু (যিনি নিজেকে দার্শনিক ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের চেয়ারম্যান হিসাবে দাবি করেছেন)  গাছে উঠে অভিনব পন্থায় ২৪ ঘন্টার প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তিনি দাবি করেন মাটিতে প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে ফেলেছে দেশের জনগণ। তাই তিনি ক্রসফায়ার, পেট্রোল বোমা, হরতাল, অবরোধের মত ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি বন্ধ করার জন্য সরকারসহ সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে এই কর্মসূচি পালন করেন। সকল পত্রিকায়, ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম তার খবর প্রচার করে। সরকারেরও দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। গ্রেফতার করা হয় তাকেও। যেখানে তার কর্মসূচি শান্তির পক্ষে- কোন নাশকতা নেই, ভাংচুর নেই, জনগনের জান-মালের কোন ক্ষতি নেই; সেখানে কার স্বার্থে তাকে গ্রেপ্তার করা হলো?
সরকার প্রধান কি ধরে নিয়েছেন হিটলার ,কর্নেল গাদ্দাফি ও সাদ্দাম হোসেনের চেয়েও তিনি শক্তিধর?
যদি ধরে নিয়ে থাকেন তাহলে তাদের পরিণিতির কথা কি একবার ভেবে দেখা দরকার নয়?
আমার কাছে কেন জানি মনে হয় সেই কুবুদ্ধিদাতা যেমন শামীমের বাবার প্রতিপক্ষকে মামলায় নামিয়ে দিয়েছিল, এখনও সরকারের আশে-পাশে থাকা বাম ঘরনার ইনু-মেননরা কুপরামর্শ দিয়ে সমাধানের পথ থেকে আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে রেখেছে। একই ভাবে এটাও মনে হয়, শামীমের বাবাকে সম্মানহানি করার দায়ে প্রতিপক্ষকে যেমন জরিমানা দিতে হয়েছিল, তেমন জরিমানা এই সরকারকেও দিতে হবে। তবে আশংকা হলো, এখন যারা সমাধানের কথা বলছেন, আসলে তখন তারা এবং জনগণ (যাদের অধিকার খর্ব করা হচ্ছে) শুধু জরিমানায় রাজি হবেন কিনা?

লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক



শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

শহীদ দিবসঃ আন্দোলনের পথে এগিয়ে যাওয়াই হোক আমাদের প্রত্যয় - মনির আহমেদ



আগুনে গরম বালু। তার ওপর তাঁকে শুইয়ে রাখা হয়েছিল। তিনি ছিলেন মৃতপ্রায়। কিন্তু মুখে ছিল সাহসের উচ্চারণ- আহাদ, আহাদ। তাঁর এই উচ্চারণে আবু জেহেল প্রচন্ড রেগে যায়। বর্শা নিক্ষেপ করে তাঁর লজ্জাস্থানে। তিনি শহীদ হন। হযরত সুমাইয়া (রা), তাঁকে আমরা চিনি ইসলামের প্রথম শহীদ হিসেবে।
হযরত সুমাইয়া (রা)র জীবনের শেষ সময়ের কথা চিন্তা করলে যে কারো হৃদয় কেঁপে উঠতে বাধ্য। কী ধরণের নির্যাতন সহ্য করেছিলেন তিনি! তবুও তিনি ইসলামের পথ থেকে এতটুকু সরে যাননি। ইসলামের পথে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে শহীদি মৃত্যুকে আপন করে নেয়ার এই ধারাবাহিকতা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলেছে। এখনো চলছে, ভবিষ্যতেও চলবে।
এই ধারাবাহিকতায়ই আমরা পেয়েছি ১১ মার্চ। আজ যখন আমরা শহীদ সাব্বির, হামিদদের ওপার যাত্রার এ দিনকে শহীদ দিবস হিসেবে পালন করি, তখন হৃদয়ে ভেসে ওঠে দূরের বা কাছের অতীতের আরো অসংখ্য শাহাদাতের ঘটনা। আমরা অনুপ্রাণিত হই, আবার প্রিয় ভাইয়ের পবিত্র মুখ, জীবন স্মৃতি আমাদের চোখে পানি আনে।
প্রিয় নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার কথা আমাদের মনে পড়ে। অকুতোভয় এই মানুষ নিজেই ফাঁসির রশি গলায় জড়িয়েছিলেন। তিনি দীর্ঘকায় ছিলেন না। কিন্তু রাব্বুল আলামীন যে তাঁকে কতটা উচ্চতায় স্থান দিয়েছেন, তা আমরা ঠিকই বুঝতে পারি।
মাওলানা মওদুদী (র)কে যখন ফাঁসি দেয়ার চেষ্টা চলছিল, তখন তিনি যে কথা বলেছিলেন, আজ তা ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের মুখে মুখে ফেরে। ‘মৃত্যুর ফয়সালা আসমান থেকে হয়, যমীন থেকে নয়।’ এই বিশ্বাস শতভাগ আছে বলেই আজো ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা কোন দ্বিধা ছাড়া মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে।
মুতার যুদ্ধে যেখানে মুসলমানদের সৈন্য সংখ্যা ছিল মাত্র তিন হাজার, সেখানে শত্রু পক্ষের ছিল লাখো সেনা সমাবেশ। রাসূল (সা) সে সময় যায়িদ বিন হারিসা (রা)কে সেনাপতি হিসেবে ঘোষণা করেন। রাসূল (সা) বলেন, যায়িদ শহীদ হলে জাফর বিন আবু তালেব (রা) সেনাপতি হবেন। আরো বলেন, জাফর শহীদ হলে আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা) সেনাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা শহীদ হলে নিজেদেরকে সেনাপতি ঠিক করে নেয়ার নির্দেশ দেন।
রাসূল (সা) এর তিনজনের নাম উল্লেখ করা অনেকের কাছে তাঁদের শাহাদাতের বিষয়টিকে স্পষ্ট করে তুলেছিল। কিন্তু এই তিন সাহাবীসহ কেউই একটুও পিছু হটেননি। তিন সাহাবীই যুদ্ধের ময়দানে একে একে শহীদি পেয়ালা পান করেছেন। তাঁরা প্রমান করেছেন, যারা মহান রবের বানী বুঝেছে, তাঁরা শহীদি মৃত্যুকে বড় পুরস্কার হিসেবেই মনে করেন।
স্বাধীনতা পূর্ব সময়ে মেধাবী ছাত্র নেতা আব্দুল মালেকের শাহাদাত প্রমান করে, আজ ছাত্রশিবিরের সাথে বিরুদ্ধ শক্তির যে শত্রুতা তা এই সংগঠনের বর্তমান কোন অবস্থানের জন্য নয়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব জায়গায়ই ইসলামী আন্দোলনের পথে বাধা দেয়া হয়েছে। অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা বারবার পবিত্র সব শরীরে বন্দুকের গুলি চালিয়েছে, ধারালো ছুরি চালিয়েছে।
শহীদ আব্দুল মালেক তাঁর চিঠিতে, লেখায় শাহাদাতের আকাংখার কথা বারবার জানান দিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশের সূর্যোদয় হবার আগেই শহীদি ধারাবাহিকতায় যে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন, তা স্বাধীন বাংলাদেশেও ইসলামী আন্দোলনকে মজুবত একটি ভিত্তি দিয়েছে। মালেক ভাইয়ের খুনের কলুষযুক্ত তোফায়েল আহমেদরা আজো যেমন ক্ষমতায় থেকে বন্দুকের নল তাক করছে, আজো প্রিয় শহীদের উত্তরসূরীরা প্রতিরোধের প্রাচিরকে নিশ্চিদ্র রাখতে নিজের বুকে গুলিকে ধারণ করছে।
উপমহাদেশের ইতিহাসের দিকে তাকালেও আমরা শহীদি পেয়ালা পানের উজ্জল সব নমুনা দেখতে পাই। শহীদ তিতুমীর বাঁশের কেল্লা গড়ে যেভাবে দখলদার অপশাসক বিরোধী আন্দোলন চালিয়ে শহীদ হয়েছেন, তা আজো ছাত্রজনতাকে আন্দোলনের পথ ধরে এগিয়ে যেতে উ’সাহিত করে। ছাত্রজনতা আজ ভার্চুয়াল বাঁশেরকেল্লার মত বিকল্প গণমাধ্যম তৈরি করে জালিম শাসকের বিরুদ্ধে বিরামহীন আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।
মিশরের ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাস পৃথিবীর যে কোন ইসলামী আন্দোলনের কর্মীর কাছে অবশ্য পাঠ্য হিসেবে বিবেচিত। ইমাম হাসান আল বান্না, সাইয়েদ কুতুবদের অসাধারণ জীবন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে নতুন প্রেরণায় উজ্জীবিত করে। সাইয়েদ কুতুবের প্রথম কারাদন্ড হয়ে এক বছর জেলে থাকার পর কর্নেল নাসের সরকারের পক্ষ থেকে বলা হল তিনি যদি পত্রিকার মাধ্যমে প্রকাশ্যে ক্ষমা চান তাহলে তাকে মুক্তি দেওয়া যেতে পারে  । মর্দে মুমিন এ প্রস্তাবের যে জবাব দিয়েছিলেন তা ইতিহাসের পাতায় অম্লান হয়ে থাকবে । তিনি বলেন ,আমি এ প্রস্তাব শুনে অত্যন্ত আশ্চার্যান্বিত হচ্ছি যে, মজলুমকে জালিমের নিকট ক্ষমার আবেদন জানাতে   বলা হচ্ছে । আল্লাহর কসম ! যদি ক্ষমা পার্থনার কয়েকটি শব্দ আমাকে ফাঁসি থেকেও রেহাই দিতে পারে ,তবুও আমি এরুপ শব্দ উচ্চারন করতে রাজি নই । আমি আল্লাহর দরবাদের এমন অবস্থায় হাজির হতে চাই যে,আমি তার প্রতি এবং তিনি আমার প্রতি সন্তুষ্ট।  আজ যখন প্রিয় বোন আসমা বেলতাগি রাজপথে আন্দোলনে থেকে শহীদ হন, তখন ইসলামী আন্দোলনের পথচলায় শাহাদাতের প্রয়োজনীয়তা আরো সুস্পষ্ট হয়।
পৃথিবীর নানা প্রান্তেই মানুষ মহান রবের বাণীকে হৃদয়ে ধারণ করে শাহাদাতের পথ ধরে এগিয়েছে। নানা প্রান্তের মানুষ দখলদার জালিম শাসকদের মোকাবেলায় নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছে। ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী আন্দোলন হামাসের নেতাকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরেই ধারাবাহিকভাবে শাহাদাতের উদাহরণ তৈরি করে চলছেন। শেখ আহমদ ইয়াসিন, আব্দুল আজিজ রানতিসির পথ ধরে মুক্ত আল আকসার আশায় আজো নিজেদের জীবনকে বাজি রাখছেন।
আমরা ভুলতে পারি না মুক্তির আশায় সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া কাশ্মিরের মুসলমানদের কথা। তেমনিভাবেই জানি চেচনিয়ার বিপ্লবীদের কথা। চীনের প্রাচিরের আড়ালে কত উইঘুর মুসলিম যে শহীদ হচ্ছেন, তা প্রচারের আলোয় তেমনভাবে আসেই না। কিন্তু কোন জায়গায়ই মুক্তিকামী মানুষের আন্দোলন একেবারে থেমে যায়নি। ইসলামের পাতাকাবাহী যুবকেরা পৃথিবীর নানা প্রান্তে আজ আরো সুসংহত।
ফিরে আসি ১১ মার্চের কথায়। ১৯৮২ সালের ১১ মার্চে মতিহারের সবুজ চত্ত্বরে আমরা হিং¯্র হায়েনাদের নিরীহ শিবির নেতাকর্মীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখি। শাহাদাতের পেয়ালা পানের মাধ্যমে এই পবিত্র সংগঠনের শহীদি খাতায় প্রথম নাম লেখান মোহাম্মদ সাব্বির হোসাঈন। লোহার রড, পাইপ গান, দা দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয় তাকে। জাসদ, ছাত্রলীগ, ছাত্র মৈত্রীর সন্ত্রাসীরা একটা ইটের ওপর আব্দুল হামিদের মাথা রেখে আরেক ইট দিয়ে থেতলে দেয়। শহীদ হন আব্দুল জব্বার ও আইয়ুবও।
পরবর্তী সময় থেকে ছাত্রশিবির ১১ মার্চকে শহীদ দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। শহীদ সাব্বির, হামিদের পথ ধরে আরো শতাধিক ভাই নিজেদের আল্লাহর পথে সপে দিয়েছেন। আমরা পল্টনের রাজপথে ২৮ অক্টোবরে মুজাহিদ, শিপনদের শাহাদাত দেখেছি। ইসলামী আন্দোলনকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে তাঁরা কীভাবে বাতিলের মোকাবেলা করে জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন, তা আজো রাজধানীর ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের স্মৃতিতে ভাস্বর।
পরবর্তী সময়ে ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে হত্যার সরকারী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ছাত্ররা জীবন দিয়েই চলছে। তবুও কুরআনের খাদেমদের কারামুক্ত করার আকাংখা ছাত্রজনতার হৃদয় থেকে মুছে যায়নি।
রাসুল (সা) এর আগমনের পূর্বেও মানুষকে সত্যের দাওয়াত দিতে গিয়ে নবী-রাসুল ও তাদের অনুসারীরা অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অনেক নবীর অনুসারীকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। হযরত মুসা (আ), ইসা (আ)সহ অনেক নবীকে দীর্ঘদিন নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। তারপরও সে সময় আল্লাহর পছন্দনীয় এই মানুষেরা ধৈর্য্যধারণ করেছেন এবং মানুষকে সত্যের পথে ডেকেই গেছেন।
আজ মুসলিম বিশ্বকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করে পশ্চিমা শক্তি মুসলমানদের হত্যা করছে। যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হয়েছে ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়ায়। এসব দেশে ইসলামপ্রিয় মানুষেরা কুরআনের আলোকে রাষ্ট্র পরিচালিত হোক তা চাইলেও তাদের সে আশাকে চক্রান্তের জালে আটকে রাখা হচ্ছে। উল্টো যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে এসব দেশের ভবিষ্যতকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে ফেলা হচ্ছে। তদুপরি এসব দেশেও ইসলামপ্রিয় মানুষেরা সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। শাহাদাতের সিঁড়ি বেয়ে একদিন এসব দেশে কুরআনের আইন প্রতিষ্ঠিত হোক সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।
শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা শাহাদাতের পূর্ব সময়ে বলে গেছেন যে তাঁর রক্ত যেন ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা বাংলাদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য কাজে লাগায়। কোন ধরণের প্রতিশোধপ্রবন মানসিকতা থেকে দূরে থাকতে নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর এই আহ্বান শহীদ ভাইদের স্বচ্ছ হৃদয়কেই আমাদের সামনে তুলে ধরে।
ইসলামী আন্দোলনের কর্মী হিসেবে শহীদ ভাইদের প্রতি ফোটা রক্তের বদলা হিসেবে আমরা অন্য কারোর রক্ত নিতে চাই না। কারোর চুল পরিমান ক্ষতি হোক তা চাই না। কিন্তু দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন থেকেও একচুল পরিমান সরে যেতে চাই না। আমাদের প্রতিশোধ হবে বাংলাদেশের সবুজ যমীনে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা।
শহীদ সাব্বির ছাত্রশিবিরের হয়ে যে মিছিল শুরু করেছেন, সে মিছিলে আজ শত শত পবিত্র মুখের সমাহার। তাঁরা আমাদের ডাকছে। অটল থাকতে বলছে। অবিচল পথ চলতে বলছে। শহীদ দিবসে শাহাদাতের চিন্তাকে হৃদয়ে যতেœর সাথে লালন করে সচেতনভাবে ইসলামী আন্দোলনের এই পথে এগিয়ে যাওয়াই হোক আমাদের প্রত্যয়। 








রবিবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০১৫

একুশের ধারাবাহিকতায় ছাত্রসমাজ : মনির আহমেদ




একে তো ভাষার জন্য এমন আন্দোলনের নমুনা পৃথিবীর কোথাও নেই, তার ওপর অধিকার আদায়ের দাবিতে ছাত্রজনতার অনন্য প্রতিবাদ; এই দুইয়ের সমন্বয় ৫২র ভাষা আন্দোলনকে অনেক উঁচুতে স্থান দিয়েছে। আর ‘লাথি মার ভাঙ রে তালা‘ গেয়ে স্বাধীকার আন্দোলনের এক চিরন্তন সবক এ দেশের মানুষ এই মহান আন্দোলন থেকেই পেয়েছে। কাজেই, আজো যে কোন আন্দোলন-সংগ্রামের কথা বলতে গেলে আমাদের বারবার একুশের দিকে তাকাতে হয়।
ভাষা আন্দোলন মুখ্যত ছাত্ররাই নেতৃত্ব দিয়েছে। সেই ১৯৪৮ সালের ২৭ নভেম্বর পাকিস্থানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের কাছে তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জি.এস অধ্যাপক গোলাম আজম বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবিতে প্রথম স্বারকলিপি প্রদান করেন । পরবর্তীতে  সদ্য প্রয়াত ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিন, ভাষা সৈনিক আব্দুল গফুররা বলিষ্ঠভাবেই সে সময় ছাত্রনেতা হিসেবে নিজেদের দায়িত্বের আঞ্জাম দিয়েছেন। তারা আমাদের সবক দিয়ে গেছেন কী করে রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে মায়ের ভাষাকে বুকে আগলে রাখতে হয়। সালাম,জব্বর,রফিক,বরকতেরা শিখিয়েছেন কিভাবে ন্যায্য দাবিকে ঘিরে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে আন্দোলনকে চূড়ান্ত লক্ষে নিয়ে যেতে হয়।
৫২র পর থেকে অধিকার আদায়ের চেতনা যেন ছাত্রজনতার রক্তে মিশে গেছে। যার ফলে পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা যুদ্ধসহ প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ছাত্র সমাজকে অনবদ্য ভূমিকা রাখতে দেখা গেছে। যদিও বর্তমান সময়ে ছাত্র রাজনীতিতে ব্যক্তি স্বার্থের কলুষ যুক্ত হয়েছে, কিন্তু ভাষা আন্দোলন ও তৎপরবর্তি  গুরুত্বপূর্ণ সব আন্দোলনের অধ্যায়ে ব্যক্তি স্বার্থ চিন্তা কারোর মাথায় এসেছে বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় না। যদিও ছাত্র রাজনীতি নিয়ে আজ নানান বিতর্ক, কিন্তু এই স্বপ্নও অনেক মানুষ দেখেন যে গণতন্ত্র রক্ষা ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ছাত্ররাই নেতৃত্ব দিয়ে যাবে।
একুশের আন্দোলনের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, সে সময় ছাত্ররা সাহস করে সত্য বলার এক উজ্জল দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিল। পাকিস্তানি শাষকদের নির্যাতন, প্রলোভন কোন কিছুই ছাত্র নেতাদের আন্দোলনের চলমান পথ থেকে একচুল বিচ্যুত করতে পারেনি। ফলে রাজপথ বুকের রক্তে ভেসে গেলেও, চলে যায়নি মুখের সাহসী উচ্চারণ।
ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতা পরবর্তীতেও আমরা পরিস্কার দেখতে পাই। ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র সমাজ অনবদ্য ভূমিকা রেখেছিল। ছাত্রনেতা আসাদ (শহীদ আমানুল্লাহ আসাদুজ্জামান) আজো গণতান্ত্রিক যে কোন আন্দোলনের প্রেরণা। আইয়ুবশাহীর সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তাঁর জীবন দান ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরেই স্থান পেয়েছে। শুধু ছাত্রনেতা আসাদ নয়, আইয়ুবশাহীর পতন ঘটাতে সে সময় সাধারণ ছাত্ররা যেভাবে রাজপথে নেমে এসেছিল, তা সত্যিই বিষ্ময়কর। এমনকি দশম শ্রেণীর ছাত্র মতিউরও বুক পকেটে মা‘কে লেখা চিরকুট নিয়ে মিছিলে অংশ নিয়েছিল। তাঁর মৃত্যু বাংলার আপামর জনসাধারণকে যেমন কাঁদিয়েছিল, তেমনি মানুষকে নতুন করে আন্দোলনের শপথে বলীয়ান করেছিল।
জাতীয় নেতাদের অনেককেই আইয়ুব সরকার কারাবন্দী করে রেখেছিলেন। কিন্তু আন্দোলনের মাঠ ফাঁকা পড়ে থাকেনি। ছাত্রনেতারা সামনে থেকে এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। গণতন্ত্রকামী মানুষেরা ছাত্রদের সাথে আন্দোলনে সোচ্চার হয়েছিল। মানুষের মনে সে সময় এই বিশ্বাস দৃঢ়ভাবেই ছিল যে ছাত্ররা আন্দোলন করছে মানে সে আন্দোলনের শতভাগ যৌক্তিকতা রয়েছে। কাজেই, আপামর জনসাধারণ আন্দোলনে অংশ নিতে কোন কুণ্ঠা বোধ করেনি। আর সেজন্যই আমরা গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের তালিকায় গৃহবধু, কৃষক, শ্রমিকসহ নানান পেশার মানুষের উপস্থিতি দেখতে পাই।
আমরা যদি ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের আগের ইতিহাসের দিকেও তাকাই, তাহলেও ছাত্র সমাজের গৌরবোজ্জল ভূমিকা দেখতে পাব। ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে ৫৮ সালের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন, ৬২র শিক্ষা আন্দোলনেও ছাত্র সমাজ বড় ভূমিকা রেখেছে।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রসমাজের অবদানের কথা অনস্বীকার্য। ১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরু হবার আগ থেকেই সচেতন ছাত্রসমাজ স্বাধীনতার জন্য কাজ করে আসছিল। সে সময়ের ছাত্রনেতা নুরে আলম সিদ্দিকী, আ স ম আব্দুর রবদের নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছিল। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে ডাকসুর ভিপি আ স ম আব্দুর রব স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তলন উদ্বোধন করেন। শ্লোগানে-মিছিলে আওয়াজ তুলে ছাত্রসমাজই সারাদেশে মানুষের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জাগরণ তৈরি করেছিল।
প্রয়াত প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ থেকে শুরু করে জাতীয় নেতাদের পথচলার পেছনে আমরা ছাত্রনেতাদের স্পষ্ট ভূমিকা দেখতে পাই। মুক্তিযুদ্ধের সসস্ত্র সংগ্রামে ছাত্রসমাজ কৃষক, শ্রমিক, মজুরদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে। ২৫ মার্চের কালো রাতে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালিয়ে ছাত্র-শিক্ষকদের হত্যা করে, তখন বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছিল, তা সসস্ত্র সংগ্রামকে আরো বেগবান করেছিল। যুদ্ধের নয় মাসে ছাত্রসমাজ সারা বাংলায় ছড়িয়ে থেকে বাংলার মানুষকে সাহস যুগিয়েছে, সব বাধা মোকাবেলা করে বিজয়ের কাঙ্খিত লক্ষে পৌছানোর স্বপ্নে মানুষকে বিভোর রেখেছে।
১৯৯০ স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলন যে সফলতার মুখ দেখেছিল, এর পেছনে ছাত্রসমাজের সবচেয়ে বড় ভূমিকা রয়েছে। ৮২ সালে সামরিক বাহিনী থেকে এরশাদ ক্ষমতা দখলের পর থেকেই ছাত্রসমাজ গণতন্ত্রের দাবি নিয়ে রাজপথে সোচ্চার ছিল। এরশাদ রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই একের পর এক ছাত্র হত্যা চালিয়ে যায়। ১৯৯০ এর অক্টোবর মাসে যখন ছাত্রনেতা নাজিমউদ্দিন জেহাদ শহীদ হন, তখনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য গড়ে উঠেছিল। এরপর থেকেই স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন সাফল্যের দিকে যাত্রা শুরু করে। ডা. মিলনসহ বেশ ক‘জনের শাহাদাতের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারের পতন ঘটে। মূলত, ১৯৯০সালের ১০ অক্টোবর গড়ে উঠা ছাত্র আন্দোলনের সফলতাই বাংলাদেশকে তখন স্বৈরাচার মুক্ত করে।
কেয়ারটেকার সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও ছাত্রজনতা অপরিসীম ভূমিকা রেখেছে। একদিকে এই সরকার ব্যবস্থার রুপকার অধ্যাপক গোলাম আযমের নেতৃত্বে জামায়াত-শিবির যেমন এই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, অন্যদিকে আওয়ামীলীগের নেতৃত্বের আন্দোলনেও ছাত্ররা ভূমিকা রাখে। যার ফলে আমরা মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে তত্তাবধায়ক সরকারের এক সুন্দর ব্যবস্থা পাই। এই ব্যবস্থা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বিকাশে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে।
পরবর্তীতেও আমরা ছাত্রসমাজের কিছু ভূমিকা দেখেছি। কিন্তু অতীতের তুলনায় তা ছিল অনুজ্জল। ছাত্র সংগঠনগুলো হারিয়েছে স্বকীয়তা, লেজুড়বৃত্তিতে ছাত্র রাজনীতি আজ কলুষিত হয়ে পড়েছে। ভাষা আন্দোলনের যে ধারাবাহিকতা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি পরবর্তীতে, আজ তা মনে করে আমাদের আফসোস করতে হয়।
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর জামায়াত ইসলামীর সমাবেশ সমাবেশ পন্ড করতে এসে পল্টন মোড়ে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা যখন জামায়াত-শিবিরের নিরীহ নেতাকর্মীদের ওপর অস্ত্রসহ হামলা চালিয়েছিল, তখনও কিন্তু আমরা এক ঝলক একুশের ধারাবাহিকতা দেখতে পেয়েছি। শহীদ মুজাহিদ, শিপনরা সেদিন জীবন দিয়ে সন্ত্রাসীদের কালো থাবা কী করে প্রতিরোধ করতে হয় তার দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে রেখে গেছেন।
যখন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ জামায়াত নেতৃবৃন্দকে বিচারিক হত্যাকান্ডের ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে, তখন থেকে বাংলাদেশে আমরা ছাত্রজনতার গণজাগরণ দেখতে পেয়েছি। আল্লামা সাঈদীর বিরুদ্ধে দেয়া সাজানো রায়ের পর ছাত্রজনতা সারা বাংলাদেশে যে আন্দোলনের নমুনা পেশ করেছে, তাও ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। শতাধিক ছাত্রজনতা একই দিনে অবিচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে যেভাবে নিজেদের জীবন দিয়েছে, তা পাঠ করে ভবিষ্যতের ছাত্রজনতা আত্মত্যাগের প্রেরণা খুঁজে পাবে।
৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের সময় যেমন দশম শ্রেণীর ছাত্র মতিউর শহীদ হয়েছে, তেমনি ভাবে ৩ ডিসেম্বর ২০১২ সাম্প্রতিক সময়ে দিনাজপুরে দশম শ্রেণীর ছাত্র মুজাহিদ শহীদ হয়েছে। আমার বিশ্বাস, ইতিহাসবীদদের সত্য লেখনিতে একদিন মুজাহিদের নামও মতিউরের মত উজ্জল হয়ে উঠবে।
৯১ সালের পর থেকে আমরা একের পর এক গণতান্ত্রিক সরকার দেখতে পেলেও দু:খজনকভাবে কোন সরকারই ছাত্রসমাজের গৌরবোজ্জল ইতিহাসের ধারাাবাহিকতা বজায় রাখতে সহায়ক হয়ে ওঠেনি। কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ার ধারাবাহিকতা এখনো বজায় রয়েছে। ফলে ছাত্রসমাজের নেতৃত্বে সঠিক ব্যক্তি উঠে আসছে না। আর সেজন্যই আমরা দেখছি সন্ত্রাসী হওয়া সত্ত্বেও কেউ কেউ ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে চলে আসছে।
ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ছাত্রসমাজ পরবর্তীতে আন্দোলনের যে ধারাবাহিকতা দেখিয়েছে, তা থেকেই বর্তমানে আমাদের প্রেরণা নিতে হবে। প্রতিটি আন্দোলন থেকে আমাদের শেখার অনেক কিছুই রয়েছে। কী করে জালিম শাসকের বিরুদ্ধে ভয়হীন হৃদয় নিয়ে দাঁড়িয়ে যেতে হয়, কী করে আন্দোলনে আপামর জনসাধারণকে একত্রিত করতে হয়, এসব আমরা একুশ ও পরবর্তী আন্দোলনগুলো থেকে শিখতে পারি।
ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসের পাঠ আমাদেরকে বলে, একুশের সংগ্রামীরা যুগের পর যুগ মানুষের জয়গান গেয়ে গেছে। একুশ যে ছাত্রসমাজের মাঝে যে স্বপ্ন ছড়িয়ে দিয়েছে, তা আজো সাধারণ ছাত্রদের মাঝে ছড়িয়ে আছে। কাজেই, বর্তমানের আওয়ামী অপশাসন বিরোধী আন্দোলনে আমাদের একুশের প্রেরণা নিয়েই ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। কোন আন্দোলনই গাছ থেকে পাকা ফল পাওয়ার মত সহজ নয়। আন্দোলনের পথে অনেক বাধা আসে, সব মাড়িয়েই ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যেতে পারলে একদিন সফলতার দেখা মেলে।
আজ শাসকের নামে যারা শোষক হয়ে বসে আছে, গণতন্ত্র হরণ করে বাকশাল কায়েমের পায়তারা করছে, তাদেরও একুশ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। শোষণ করে ক্ষমতায় টেকা যায় না, এ সত্য ইতিহাসের পাতায় স্পষ্ট প্রতীয়মান। এভাবে শোষণের পথ ধরে হাঁটতে থাকলে শুধু আওয়ামীলীগ নয়, যে কোন শাসকেরই পতন অবধারিত।
সবশেষে বলতে চাই, একুশ থেকেই আমরা জানি- ছাত্রজনতা সবই পারে। আজকের জালিম শাসক যদি স্বেচ্ছায় মসনদ থেকে সরে না দাঁড়ায়, তাহলে আগামী দিনে ছাত্রজনতা তাদেরকে চরম শিক্ষা দেবে। শুধু সময়ের ব্যাপার, ছাত্রজনতার জয় হবেই ইনশাআল্লাহ।



সোমবার, ১ ডিসেম্বর, ২০১৪

ছাত্র রাজনীতি: লেজুড়বৃত্তিতে বাড়ছে অবক্ষয়


মনির আহমেদ

বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতিতে অবক্ষয় বাড়ছেই। কোনভাবেই যেন লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছেনা ছাত্র নেতাদের। ক’দিন আগেও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীন কোন্দলে সুমন চন্দ্র নিহত হয়েছেন। একই ভাবে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজে কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে একজন নিহত হয়েছেন। এ ধরণের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। ‘প্রথম আলো’র প্রতিবেদন অনুযায়ী গত ছয় বছরে অভ্যন্তরীন কোন্দলে ছাত্রলীগের ৩৯ নেতাকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। যেখানে ছাত্র সমাজ চলমান রাজনীতির কলুষ মুক্ত থেকে দেশীয় রাজনীতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার কথা, সেখানে আমরা উল্টো চিত্র দেখছি। এর একটি অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় ছাত্র সংগঠনগুলোর লেজুড়বৃত্তি। স্বকীয়তা হারিয়ে ছাত্র সংগঠনগুলো আজ অবক্ষয়ে পেয়ে বসা রাজনৈতিক নেতাদের ইশারা-ইঙ্গিতে পরিচালিত হচ্ছে। এই লেখায় এ বিষয়েই বিশ্লেষণের প্রয়াস পাচ্ছি।
বলে রাখি- লেজুড়বৃত্তির বাইরে থেকে মেধাবী ছাত্রদের দ্বারা পরিচালিত ছাত্র সংগঠন যে দেশে নেই, তা বলা যাবে না। স্বকীয় অবস্থান ধরে রেখে নিজস্ব সংবিধানের আলোকে পরিচালিত সংগঠন এখনো রয়েছে। কিন্তু যেখানে বেশির ভাগ ছাত্র সংগঠনের একই অবস্থা, সেখানে এ ধরণের সংগঠনকে ব্যতিক্রম হিসেবে চিহ্নিত করা ছাড়া কোন উপায় থাকে না।
প্রশ্ন হলো, কেন ছাত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত তরুণরা লেজুড়বৃত্তিতে মেতে থাকছে? কেনইবা যোগ্যতা অর্জনের চিন্তা থেকে সরে এসে নেতাকে খুশি করার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছে? যেখানে শিক্ষকদের পিতার সমতুল্য শ্রদ্ধা করার কথা, সেখানে একজন ছাত্র হয়েও অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করছে! ছাত্রছাত্রীদের সাথে যেখানে সুসম্পর্ক রেখে তাদের কল্যানে ভূমিকা রাখার কথা, সেখানে কেনইবা কিছু সংখ্যক ছাত্রকে অনৈতিক সুবিধা দিয়ে দলে আনার চেষ্টা করছে?
সোজা কথায় বললে, নানাভাবে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা মাথায় চেপে বসেছে ছাত্র রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্টদের। ক’দিন আগে প্রধানমন্ত্রীর মাননীয় উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের বক্তব্য আমরা শুনেছি। তিনি যেভাবে ও যে ভাষায় কথা বলেছেন, তাতে বোঝা যায় যে ছাত্রদের হালুয়া-রুটি ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে, যেন তারা মুরুব্বিদের কথা মেনে কাজ করে।
এইচ টি ইমাম ছাত্রলীগ নেতাদের বিসিএসে শুধু পাশ করার জন্য বলেছেন। আর পাশ করতে পারলে মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করে দেয়ার ব্যবস্থা করবার আশ্বাস দিয়েছেন। মাননীয় উপদেষ্টাসহ সরকারী দলের অনেক নেতাই এ ধরণের বক্তব্য অতীতে রেখেছেন। তাদের কথার যথার্থ নমুনা দেখা যায় বিভিন্ন সময়ে।
এলাকার এক ছোট ভাইয়ের কথা বলতে পারি। এসএসসি পাস করার পর সে ছাত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়েছিল। পড়াশোনায় কখনও সে খুব ভাল ছিল না। একদিন দেখা হতেই জিজ্ঞেস করলাম- কেমন আছো, কি করছ এখন?
বললো, ভাই ভালই আছি। অনেক কষ্ট করে এম পি সাহেবকে বলে ব্যাংকে একটা জব নিয়েছি। সেখানেই এখন ভালোভাবেই আছি।
আমি হাসতে হাসতে প্রশ্ন করলাম, এই কারণেই কি বাড়িতে আসলে বেশ রাজনীতি চর্চা করছো?
তার সহজ উত্তর, ভাই কী করব! না করে তো পারিনা। এখন তো অনেকটা বাধ্য। এই ছোট ভাইটিই বছর খানেক আগে প্রকাশ্য অস্ত্র নিয়ে হামলা করে আহত করেছিল তার এলাকারই প্রতিপক্ষের কয়েকজন ছাত্রকে। ছাত্র নেতাদের অবৈধ সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তারা যে এই নেতাদের দিয়ে অনেক কিছু করিয়ে নিচ্ছেন, তা সহজেই বোঝা যায়। অনেক ছাত্র নেতাদের দ্বারা খুন, গুমসহ নানা ধরণের সন্ত্রাসী কর্মকা- পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এসবের পেছনে ইশারা রয়েছে, গ্রিন সিগনাল রয়েছে। আর এইচ টি ইমামের মত নেতারাই যে এসব ইশারা করেন, তা জনগণের বুঝতে বাকি নেই।
এখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, ছাত্র রাজনীতি করা মানে কিছু সুযোগ-সুবিধা আদায়। ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা তাই সেই পথেই ঝুঁকছে। এইচ টি ইমাম তার বক্তব্যে একটি বড় সত্য প্রকাশ করেছেন। দলীয় ক্যাডারদের প্রশাসনে নিয়োগ দেয়ার ফলে তারা যে গত নির্বাচনে আওয়ামীলীগকে ক্ষমতায় বসাতে যা সম্ভব তা-ই করেছেন, তা এই আওয়ামী নেতার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে। কাজেই এ কথা স্পষ্ট করেই বলা যায়, আজ যারা ছাত্রলীগ করছেন, তারা মুখে বড় কথা বললেও কোন আদর্শকে ধারণ করে মোটেও রাজনীতি করেন না। তাদের রাজনীতি মানে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করা। নেতাদের পিছু পিছু ঘুরে নিজেদের আখের গোছানো।
এ ধরণের রাজনীতিতে যে মেধার চর্চা নেই, মেধাবীর মূল্যায়ন নেই; তা দলের নেতাকর্মীদের কর্মকা-েই দৃশ্যমান। সিলেটে সুমন চন্দ্র নিহত হলেন আর ঢাকায় বসে ছাত্রলীগের সভাপতি বললেন, সুমন চন্দ্র ছাত্রলীগের কেউ নয়। এর জন্য তার সংগঠনের কোন দায় নেই।  দায়হীন থাকার যে সংস্কৃতি আমরা জাতীয় রাজনীতিতে দেখছি, এটা কি তার অন্ধ অনুকরণ নয়?
গত উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামীলীগের পক্ষে সারাদেশে যে ব্যাপক কারচুপি হয়েছে, তা দিবালোকের মত স্পষ্ট। আর এই কারচুপির জন্য সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। সদলবলে গিয়ে ভোট কেন্দ্র দখল, ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা, জোরপূর্বক বের করে দেয়াসহ নানান অপকর্মের সাথে তারা জড়িত ছিল। নেতার হয়ে যে কোন অপকর্ম করতে তাদের কোনভাবেই বাধে বলে মনে হয় না।
জনগণের প্রাণের দাবি, ছাত্র রাজনীতি ছাত্রদের দ্বারাই পরিচালিত হবে। ওপর থেকে কেউ ছড়ি ঘোরাবে না। ছাত্ররা রাজনীতি করার মাধ্যমে মানুষ হিসেবে নিজেদের উৎকর্ষ সাধনের সুযোগ পাবে। নিজেদের যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলে পরবর্তীতে দেশ ও সমাজের নেতৃত্বদানে সক্ষম হিসেবে প্রমানিত করবে। কিন্তু জনগণের দাবির প্রতিফলন ছাত্র রাজনীতিতে নেই। যার ফলে ছাত্র রাজনীতি দিনেদিনে আরো কলুষিত হচ্ছে, আর তার সাথে দেশের ভবিষ্যতও হচ্ছে অন্ধকারাচ্ছন্ন।
একজন সচেতন মানুষ কখনোই একটি টেপ রেকর্ডারের মত নয়। একটি টেপ রেকর্ডার যে কোন কিছু ধারণ করে হুবহু তা তুলে ধরে। সচেতন যে কোন মন কোনকিছু শোনার পর তা যাচাই করে নেয়। নিজের বিবেচনা বোধকে কাজে লাগিয়ে কোন কাজে যুক্ত হয়। কিন্তু ছাত্র রাজনীতির সাথে আজ যারা যুক্ত, তাদের মাঝে এ বিবেচনা বোধ আছে কি?
                                                                                                              .....চলবে



মঙ্গলবার, ৪ নভেম্বর, ২০১৪

তরুণ প্রজন্ম জানতে চায় দালাল আইনে ফাঁসীর আদেশ হওয়া সেই ২২ জন কে ???



স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা মানবতা বিরুধী অপরাধ করেছিল শেখ মজিবুর রহমান দালাল আইন করে তাদেরকে বিচারের আওতায় নিয়ে এসেছিলেন,সেই আইনে মোট লক্ষাধিক লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল,এর মধ্যে যাচাই- বাচাই করে ৩৫০০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছিল। তদন্ত শেষে ১১০০০ হাজার জনের বিরুদ্ধে সার্জশীট দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ২২ জন কে ফাঁসি, ৬৮ জনকে যাবজ্জীবন, ৭৫২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়ে ছিলেন আদালত।
তাদের বিরুদ্ধে খুন,ধর্ষণ,অগ্নিসংযোগের মত অভিযোগ আমলে এনেছিলেন।
বাকী ২৪০০০ জনের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ প্রমানিত না হওয়ায়, আদালত তাদেরকে খালাশ প্রদান করেন।

এই সব তথ্য আওয়ামী খাদ্যমন্ত্রী এ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম একটি টকশোতে উপস্থাপন করেন।

এখন জাতি আপনাদের কাছে জানতে চায় ফাঁসীর আদেশ হওয়া সেই ২২ জন কারা ছিল ????
কোন্ ৬৮ জনকে যাবজ্জীবন সাজা দেয়া হয়েছিল ????
বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রাপ্ত ৭৫২ জন কারা ছিল????
সেখানে কি বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীর এখন যাদের বিচার করা হচ্ছে তাদের কারো নাম ছিল?

যদি না থেকে থাকে, তাহলে কাদেরকে খুশি করার জন্য আজকে নেতৃবৃন্দকে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।
বিষয়টা পরিষ্কার করবেন কি?

প্রিয় বন্ধুরা

আসসালামুআলাইকুম , 
কেমন আছেন ? জানি আপনারা হয়ত খুব ভাল নেই । কারন বাংলাদেশে বিরোধী জোটের অন্যতম প্রধান শক্তি বৃহত্তর ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীর মূল নেতৃবৃন্দের বিষয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে আওয়ামীলীগ গৃহপালিত ট্রাইবুনালকে দিয়ে জুডিশিয়াল কিলিং এর মাধ্যমে বিরোধী জোটকে নেতৃত্বশুন্য করার পায়তারার অংশ হিসাবে এক এক করে ফাঁসির আদেশ দিয়ে যাচ্ছে । বাংলাদেশের ইতিহাসে কলংক লেপনের মহোৎসবে মেতে উঠেছে তারা । তাদের প্রয়োজন ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করা । তারা ইতিমধ্যে বুঝে ফেলেছে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার পথে একমাত্র বাধা বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী ,সতরাং তাদেরকে নিঃশেষ করে দিতে পারলে আর ঠেকায় কে? এবং তারা এটাও ধরে নিয়েছে যে ,নেতৃবৃন্দদের হত্যা করে পেলতে পারলেই জামায়াতের শক্তিতে ভাটা পড়বে ,কর্মীবাহিনী হতাশ হয়ে যাবে ,কেউ আর আন্দোলনে সাহস পাবেনা , আর জামায়াত যদি আন্দোলন না করতে পারে তাহলে বাংলাদেশে আর কোন রাজনৈতিক শক্তি নেই যারা সরকারের পৃষ্ঠপোষক বাহীনির গুলির মূখে রাজপথে আন্দোলন করবে । সুতরাং সরকারের টার্গেট এক ঢিলে সকল পাখি শেষ । সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে তারা । মাঝে মাঝে নিজে নিজে হাসি ,হায়রে আওয়ামীলীগ ! তোমাদের জন্য দুঃখঃ হয় ,এই জন্য যে । যে কেউ কবর জগতে চলে যাওয়ার আগে তার একটা প্রজন্ম রেখে যেতে চায় ,আমার কাছে মনে হয় আওয়ামীলীগ সেটা চায় না । তারা জামায়াত কে জাসদের মত সংগঠন ধরে নিয়েছে । তারা ভাবছে যে জাসদকে স্বাধীনতা উত্তর সবচেয়ে বেশী নির্যাতন করেছি ,হত্যা করেছি ,খুন করেছি, গুম করেছি , সেই জাসদ যখন থালা নিয়ে রাস্তায় বসার অবস্থায় টিকে থাকার জন্য আমাদের সাথে এসে যোগ দিয়েছে ,জামায়াতকেও যদি নেতৃত্ব শুন্য করে দেয়া যায় তারাও এক সময় শক্তি শেষ হতে হতে হয়ত আমাদেরকেই শেষ ভরসা মনে করবে ,তখন বাংলাদেশ শুধু আওয়ামীলীগেরই থাকবে । হায়রে আওয়ামী স্বপ্ন !!!!

চলবে ------

শনিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

শয়তানের কাছে আত্মা বিক্রির ফাঁদে পা দেন নি তো ?

শেখ শওকত হোসেন নীলু ,রাজনীতিবিদ হিসাবে অনেক পরিচিতি তার ! বাম ঘরনার রাজনীতিবিদ হিসাবে তার উত্থান ,যেখানেই যান নিজের পছন্দের চেয়ার টা থাকা চাই , পান ও তিনি । তিনি বললেন আমরা নির্যাযিতদের পক্ষে , নির্যাতনকারীদের পক্ষে নয় । তাই নিজের পরামর্শ মুল্যায়িত না হওয়ায় মূলত ২০দলের কর্মকান্ডে তিনি অনিহা প্রদর্শন করলে, জোট থেকে বহিষ্কৃত হন তিনি। গঠন করেন ১০ দলীয় জোট ।
গতকাল হঠাৎ চ্যানেল ২৪ এ তার টকশো, যদিও লাইব দেখতে পারিনি । ফেইজবুকের কল্যানে তার বক্তব্যটাই শুধু দেখতে পেলাম । তিনি বললেন সরকারের উচিৎ নির্যাতিতদের পক্ষে থাকা ,কিন্তু বাংলাদেশে যে সরকারই ক্ষমতায় আসে ,তারাই নির্যাতন কারীদের পক্ষে অবস্থান নেয় । তিনি আরো বলেন আমরা নির্যাতিতের পক্ষে কাজ করবো।
নিলু সাহেব মানুষ যত প্রবিন হয় , কারো বুদ্ধি বাড়ে কারো কমে ,কেউ অত্ম মর্যাদা নিয়ে বেচে থাকতে চায় ,কেউ জীবন নিয়ে । আমি জানিনা আপনার বুদ্ধি বাড়ছে না কমছে ? আপনি কি জীবন নিয়ে বেছে থাকতে চাচ্ছেন, না আত্ম মর্যাদা নিয়ে ? আপনার বক্তব্য নির্যাতিতদের পক্ষে থাকার ,না নির্যাতিতদের সহমর্মিতা পাওয়ার?
ডা: রেজওয়ান সিদ্দিকী ক;দিন আগে রেডিও তেহরানের কথা বার্তা অনুষ্ঠানে কথা বলতে গিয়ে গনজাগরন মঞ্চের নেতৃবৃন্দের বিষয় নিয়ে বললেন যারা শয়তানের কাছে তাদের আত্মা বিক্রি করে দেয় তাদের চাহিদা মানুষের কাছে আবেগ সৃষ্টি করতে পারেনা ।
একই দিনে রাশেদ খান মেনন বলেছিলেন তাদের প্রয়োজনিয়তা ফুরিয়ে গেছে ,মানুষের কাছে এই মঞ্চের আর কোন প্রয়োজনীয়তা নাই ।
আমার কাছে কেন জানি জানতে ইচ্ছে হচ্ছে ড.রেজওয়ান সিদ্দিকির সেই বক্তব্য ; শয়তানের কাছে আত্মা বিক্রির ফাঁদে আপনি পা দেন নি তো ? নাকি আপনার প্রয়োজনিয়তা ২০ দলের কাছে তুলে ধরতে পারেননি ?

রবিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

নির্যাতিত জনপদ বাংলাদেশ


মনির আহমেদ

বাংলাদেশ। পাকিস্তানীদের পরিকল্পিত শোষণ-নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে নতুন যাত্রা শুরু করার পরিকল্পনা ছিল অনেক আগেই। সময়ের গতিধারায় সেই সুযোগও তৈরি হয়। দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ শেষে যাত্রা শুরু হয় স্বপ্নের শোষনমুক্ত স্বাধীন-সার্বভৌম একটি রাষ্ট্রের। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, যাত্রা শুর করার পর থেকেই দেশটির রাষ্ট্রশক্তি দ্বারা শোষিত হয়েছে সাধারণ জনগণ, নির্যাতিত হয়েছে বিরোধী পক্ষ। গণতন্ত্র রক্ষার কথা বলে বিরোধী শক্তিকে স্বমূলে নিঃশ্চিহ্ন করার পায়তারা চলছে সব সময়।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের কথাই বলি। ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের পর থেকেই শুর হয় রাষ্ট্রশক্তির অত্যাচার ও হত্যাযজ্ঞ। ১৯৭২থেবে ৭৪ সাল পর্যন্ত বিরোধী শক্তিকে শেষ করে একনায়কতন্ত্র কায়েমের চিন্তায় হত্যা করা হয় প্রায় ৩৭ হাজার বিরোধী নেতাকর্মীকে। অসংখ্য মানুষের কোন খোঁজ খবর পাওয়া যায়নি। হত্যা করাটাই মনে হয়েছে শাসন ক্ষমতার একমাত্র কাজ। যা আমরা শর্মিলা বসু, মেজর ডালিমের লেখায় দেখতে পাই।
১৯৭৪ সালে শুরু হয় দূর্ভিক্ষ। রাস্তায় পড়ে থাকা জীবন্ত মানুষের দেহ থেকে কাক ঠোকর মেরে চোখ উঠিয়ে নিয়ে যায়, তাড়ানোর ক্ষমতা সেই মানুষের। রাস্তায় পড়ে থাকা উচ্ছিষ্ট কুকুর-মানুষ ভাগাভাগি করে খায়, কারো প্রতি কারো কোন অভিযোগ নেই। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের আঁকা ছবিতে এ অবস্থা স্পষ্ট ধরা পড়েছে।

১৯৭৫ সাল: গঠিত হয় বাকশাল। এরপর নির্যাতনের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। দেখতে দেখতে চলে আসে ১৫ আগষ্ট, সেদিন শেখ মজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে হত্যা করা হয় জিয়াউর রহমানকেও। শুর হয় নিয়ম রক্ষার আন্দোলন। স্বৈরাচার এরশাদ ক্ষমতায় আরোহন করেন। নয় বছর পর শুর হয় গণতন্ত্রের যাত্রা। ভালোয় ভালোয় কাটেও কিছু দিন।

১৯৯৮ সাল: রাষ্ট্রযন্ত্র কর্তৃক নির্যাতন শুর হয় বিরোধী শক্তির প্রতি। হত্যা করা হয় অর্ধশতাধিক তাজা প্রাণ। গ্রেপ্তার করে নির্যাতন করা হয় শায়খুল হাদীসের মত দেশবরেণ্য আলেমদের।

২০০৬ সাল: ২৯ অক্টোবর ক্ষমতা ছাড়ার কথা তৎকালীন জোট সরকারের। ২৮ অক্টোবর ঘটে ভিন্ন ঘটনা। আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনী কর্তৃক ২৪জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়। লগি-বৈঠার তা-বে ল-ভ- হয়ে যায় পুরো দেশ।

২০০৯ সাল: ধর্ম নিরপেক্ষবাদীরা ক্ষমতায় আরোহন করে তা স্থায়ী করার হীন উদ্দেশ্যে ২৫ ফেব্রয়ারি দেশের অতন্দ্র পহরী সেনাবাহিনীর চৌকষ কর্মকর্তাদের একত্রিত করে কৌশলে হত্যাযজ্ঞ চালায়। শুর হয় নির্যাতনের ভিন্ন মাত্রা। এর পরপরই হত্যা করা হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রনেতা শরিফুজ্জামন নোমানীকে।

২০১০ সাল: বিরোধী শক্তি নির্মূলের নতুন কৌশল হাতে নেয় সরকার। নিজেদের অভ্যন্তরীন কোন্দলে খুনের শিকার হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র ফারুক। এই ঘটনায় ছাত্রশিবিরের ওপর মিথ্যা দোষ চাপিয়ে শুরু হয় চিরুনী অভিযান, যার লক্ষ্যই ছিল এই সংগঠনকে নির্মূল করা। এ সময় গ্রেপ্তার করা হয় সারা দেশে প্রায় ২২ হাজার নেতা কর্মীকে। ২৯ জুন ঠুনকো অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় বিশিষ্ট রাজনীতিবীদ ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নীজামী, দেশের খ্যাতনামা ইসলামী চিন্তাবীদ আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহীদসহ শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে। এরপর শুরু হয় নির্যাতনের নতুন মাত্রা।
সারাদেশে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের কার্যালয় বন্ধ করে দেয়া হয়। অঘোষিত নিষিদ্ধের ফাঁধে পড়ে রাজনীতি। পরবর্তীতে নেতৃবৃন্দকে অভিযুক্ত করা হয় যুদ্ধাপরাধের তথাকথিত মামলায়। গ্রেপ্তার করা হয় অনেককেই। বিচার কার্য দ্রুত এগোতে থাকে।
৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩। এ দিন আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদ- ঘোষনা করা হয়। পরিকল্পিত মিথ্যা রায়ের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসে সাধারণ জনগণ। হত্যাযজ্ঞ চালানো হয় তাদের উপর। অন্যদিকে পুলিশ র‌্যাবের পাহারায় নাটক মঞ্চস্থ হয় শাহাবাগে। ২৮ ফেব্রুয়ারি গৃহপালিত ট্রাইবুনাল বিশ্ববরেণ্য আলেমে দ্বীন মাওলানা সাঈদীর ফাঁসির রায় ঘোষণা করে। প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে দেশে লাখো জনতা। র্নিবিচারে গুলি চালানো হয় তাদের ওপর। এক সপ্তাহে হত্যা করা ২১৭জন নিরীহ মানুষকে। গেপ্তার করা হয় ৫২ হাজার সাধারণ মানুষকে। রিমান্ডের নামে নির্যাতন চালানো হয় ১৭ হাজার মানুষের ওপর। পঙ্গুত্ব বরণ করেন ১০৭জন। আহত হন হাজারো সাধারণ জনতা। মামলা করা হয় প্রায় ৩ লক্ষ মানুষের বিরুদ্ধে। গ্রেপ্তার করা হয় ছাত্রশিবিরের তৎকালিন সভাপতি মেধাবী ছাত্র নেতা দেলাওয়ার হোসেরকে। রিমান্ডে একটানা ৫৩ দিন নির্যাতন করে পঙ্গু করে দেওয়া হয় তাঁকে। যা ইতিহাসে নজির বিহীন। ৫৪টি মামলা দেওয়া হয় তার বিরুদ্ধে, এখনো তিনি জালিমের কারাগারে বন্দী।
এদিকে শ্রদ্ধেয় নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার যাবৎজীবন কারাদন্ড পরিবর্তন করে ফাঁসির রায় ঘোষনা করা হয়। ১২ ডিসেম্বর রাত ১০টায় মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসি কার্যকর করা হয় আব্দুল কাদের মোল্লার। হারিয়ে যায় ইতিহাসের এক নক্ষত্র, দেশের এক মূল্যবান সম্পদ। বিশ্বের প্রায় সকল রাষ্ট্রে তার জানাযা অনুষ্ঠিত হয়, অংশগ্রহন করে বিশ্বের কোটি জনতা।

এখোনো থেমে নেই হায়নারা। এক এক করে তারা শেষ করে দিতে চায় ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে। দমন করতে চায় বিরোধী শক্তিকে, ধর্ম নিরপেক্ষতার নামে নিঃশেষ করে দিতে চায় ইসলামকে।
আমরা বলতে চাই, বাংলাদেশের ইসলামপ্রিয় কোটি তরুণ বেঁচে থাকতে আমাদের পথ চলাকে স্তব্ধ করে দেয়া যাবে না। আমরা জানি, রাত যত গভীর হয়, প্রভাত ততই নিকটে আসে। আমরা অপেক্ষা করছি একটি সোনালী সুর্যোদয়ের। আর তা আমরা দেখতে পাবোই ইনশাআল্লাহ।

একাত্তর জার্নাল ও একজন গডফাদারের টক শো


মনির আহমেদ
একাত্তর জার্নাল, নামের সাথেই কেমন একটা বিপ্লবী গন্ধ। একাত্তর আমাদের হৃদয়ের সাথে সম্পৃক্ত একটি শব্দ । একাত্তরেই আমরা হানাদার বাহিনীর শোষন নির্যাতনের হাত থেকে  মুক্তি পেয়েছিলাম। মাথা উঁচু করে দাড়াঁনোর সাহস অর্জন করেছিলাম। যদিও স্বাধীনতার আসল স্বাদ থেকে জাতি এখনও বঞ্চিত। যাক, এ সব বলে সময় নষ্ট করতে চাই না।
বলছিলাম একাত্তর টেলিভিশন সম্পর্কে। আওয়ামী সরকারের গত মেয়াদেই টেলিভিশনটির যাত্রা শুরু। অনেকেই আবেদন করেছিলেন টিভি চ্যানেলের জন্য। জানা মতে, ৭১ নামের জন্য আবেদন করেছিলেন দুইজন। এক খ্যাতনামা সাংবাদিক এবিএম মুসা, অপরজন মোজাম্মেল বাবু। সরকারের সাথে সখ্যতা বেশী থাকায় মোজাম্মেল বাবুই মালিক হলেন একাত্তরের।
দিনে দিনে একাত্তর বিটিভির ভূমিকার দিকেই এগুতে থাকলো। একাত্তর টিভির সম্পর্কে বলতে গিয়ে দু’জন টকশো সঞ্চালকের কথা না বললেই নয়। এই দুই সঞ্চালক একটু বেশীই বলার চেষ্টা করেন। বেশী বলার জন্য টকশোর আমন্ত্রিত অতিথির কাছে একবার ধমকও খেয়েছিলেন একজন। এই দু’জন হচ্ছেন সামিয়া জামান ও নবনিতা চৌধুরী।
সামিয়া জামানের অবশ্য আরেকটি পরিচয় আছে। তিনি চলচ্চিত্র নিয়েও কাজ করেন। দিন যত যাচ্ছে, বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলো ততই পরিবর্তিত হচ্ছে। একাত্তর টিভির দিকে তাকালে তাই স্পষ্ট বোঝা যায়।  বিগত সময়ে আওয়ামী সরকারের ক্ষমতা যখন পাঁচ বছর মেয়াদের শেষ পর্যায়ে, তখন হঠাৎ করেই ২০১৩ সালের অক্টোবরে এই টেলিভিশনের পঞ্চাশ ভাগ শেয়ার বিক্রি করা হয় মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামালের কাছে। মোস্তফা কামাল তার ছেলে, দুই মেয়ে ও নিজের নামে কিনে নেন পঞ্চাশ ভাগ শেয়ার। ভালোয় ভালোয় সময় কেটে যাচ্ছে, কিন্তু বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না।
 সম্প্রতি হঠাৎ করেই শাকিল আহমেদের সঞ্চালনায় পরিচিত রাজনৈতিক নেতা শামিম ওসমান ও সেলিনা হায়াত আইভিকে দেখলাম। বিষয় ছিল নারায়নগঞ্জের সাত খুন। মজার বিষয় হলো- যার বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ এবং যিনি অভিযোগ কারী, দুজনই আলোচক। মনে হলো বিচারকের ভূমিকায় শাকিল আহমেদ, একজন আসামী, অপরজন বাদী। বাদী এবং আসামীর চেয়ে বিচারকের অবস্থা দুর্বল হলে যেমনটি হয়, টকশোর অবস্থা দেখে তেমনই মনে হলো।
আশ্চর্য হয়েছি শাকিল সাহেবের নির্বুদ্ধিতা দেখে। তিনি মেহমান করলেন এমন দুজনকে যারা বিভিন্ন সময়ে পরস্পর পরস্পরের প্রতি অভিযোগ করে আসছেন। সাধারন মানুষও বুঝে যে, কিছু অভিযোগ সঠিক, কিছু অমুলক। যে বিষয়টি নিয়ে টকশো সে হত্যাকান্ড কার ইশারায়, কার প্রয়োজনে হয়েছে, এটা বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতা, বুদ্ধিজিবী ও সাংবাদিক; সকলেই বুঝেন। শাকিল সাহেব যে বুঝেন না, তা কিন্তু নয়। একজন ডাকাতকে ধরে নিয়ে এসে সম্মান দিয়ে তাকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়- আপনি ডাকাতি করেছেন কি? তিনি কি বলবেন- হ্যাঁ আমি ডাকাতি করেছি? একই ভাবে টকশোর সঞ্চালক সেলিনা হায়াৎ আইভিকে বললেন, আপনি যে বার বার নারায়ন গঞ্জের গডফাদার বলেন, এই গডফাদার বলতে কাকে বুঝাতে চান? তার সহজ উত্তর, আমার সামনে যে বসে আছে সে এই গডফাদার। আবার শামীম ওসমানকে জিজ্ঞেস করলেন, এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কি ? এখানেই উত্তেজনার শুরু।
যাক, এই টকশো নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে। শুধু এতটুকু বলতে চাই, একটি বিচারাধীন বিষয় নিয়ে টকশোর আয়োজন করে দুজন রাজনৈতিক ব্যক্তির পারস্পরিক সৌজন্যবোধের জায়গাটাও নষ্ট করে দিয়ে প্রতিহিংসা আরো শতগুন বাড়িয়ে দেয়ার যে পরিবেশ তৈরি করা হলো, সেটা কার স্বার্থে? সরকারের নাকি জনগনের স্বার্থে? না একাত্তরকে বিটিভির চেয়ে বেশী ভূমিকা পালনকারী বুঝাতে এই অবস্থা?
মোজাম্মেল বাবু পঞ্চাশ ভাগ শেয়ার বিক্রি করলেও পরিচালক কিন্তু  আপনিই। কাজেই, অভিযোগ থেকে কাউকে বাঁচানোর জন্য এমন  তাবেদারি না করে সুযোগ থাকলে নিরপেক্ষ থেকে চ্যানেল পরিচালনা করুন। সকল মতকে গুরুত্ব দিন। সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গায় নিজেকে নিয়ে আসার চেষ্টা করুন। করো সমস্যা সমাধানের পথ বের করে দিতে ভূমিকা রাখুন। উত্তেজিত করতে নয়।
##

তালা - পাইকগাছা সড়কের বেহালদশা


 বিশেষ প্রতিনিধিঃ বাংলা সংবাদ২৪
সাতক্ষিরা জেলার তালা উপজেলার ১৮ মাইল এলাকা থেকে শুরু হয়ে তালা - পাইকগাছা সড়ক  চলাচল অনুপযোগী হয়ে পড়েছে । বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে , অবস্থা এতই বেগতিক যে, যাত্রীদের হাসাহাসি করে বলতে শুনা গেছে ,কোন নয় মাসের গর্ভবতি মা এই রাস্তা দিয়ে কোথাও যাওয়ার জন্য গাড়ীতে উঠলে গর্ভপাত হয়ে যাওয়ার খুবই সম্ভাবনা রয়েছে ।
সরেজমিন পরিদর্শন করে জানা যায় ,১৮মাইল এলাকা থেকে পাইকগাছা পর্যন্ত প্রায় ৪৫-৫০ কিলোমিটার সড়ক দীর্ঘ দিন থেকে চলাচল অনুপযোগী হয়ে পড়েছে । ১৮ মাইল থেকে পাইকগাছা পর্যন্ত যেতে আগে যেখানে সময় লাগত ২ থেকে আড়াই ঘন্টা ,এখন একই রাস্তা যেতে এখন সময় লাগে ৪ থেকে সাড়ে চার ঘন্টা । খুলনা থেকে পাইকগাছা পর্যন্ত যে বাস সার্বিস চালু ছিল তা অনেক দিন রাস্তা সমস্য থাকায় তালা বাজার পর্যন্ত গিয়ে আর যেতে পারছেনা । এর কারনে এলাকার সাধারন মানুষ যাতায়াত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে । তালা থেকে কফিলমুনি হয়ে পাইকগাছা পর্যন্ত যাতায়াতে এখন মোটর সাইকেলই হয়ে পড়েছে প্রধান বাহন । এ ছাড়াও নছিমন,করিমন,ভেন ইত্যাদি যানবাহনে ঝুকি নিয়েই প্রতিদিন চলাচল করছে হাজারো মানুষ । খুলনা দক্ষিন অঞ্চলের বানিজ্যিক কেন্দ্র নামে খ্যাত কপিলমুনি বাজার এখন খুলনা থেকে মালামাল আনা নেয়ায় জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার সাধারন মানুষকে গুনতে হচ্ছে দ্বিগুন মাশুল । হু হু করে বেড়ে যাচ্ছে নিত্য প্রয়োজনিয় দ্রব্য মুল্যের দাম । এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় এক দোকানদার বলেন ,রাস্তাটি সংস্কার কাজ শুরু করার আগ পর্যন্ত আমরা গাড়িতে করে কফিলমুনি পর্যন্ত মালামাল আনতে পারলেও ,কাজ শুরু করে রাস্তা খুড়ে ফেলে রাখায় সেটা আর সম্ভব হচ্ছে না । তাই যাতায়াত খরচ বেড়ে যাচ্ছে, খরচ পোষানোর জন্য  আমাদেরকেও একটু বেশী মূল্যে বিক্রি করতে হচ্ছে ।  কয়রা উপজেলার হুমায়ন কবির নামের এক ব্যক্তির সাথে কথা বলে জানা যায় প্রতিদিনই রাস্তায় ছোট খাট দূর্ঘটনা ঘটছে ,মানুষ আহত হচ্ছে । একই কারনে সঠিক চিকিৎসা নেয়াও কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য এড.মোস্তফা লুৎফুল্লাহর  নিকট রাস্তার সংস্কার কাজটি কবে নাগাদ শেষ হতে পারে মুঠো ফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন গত এম পি সাহেবের আমলে কাজটির টেন্ডার হয় ,তারা কাজটি শুরু করে,কিছু অংশ কাজ শেষ করে । অধিকাংশ অংশ শেষ করতে না পারায় জনদুর্ভোগ বেড়ে যায়। আমি আসার পরে কাজটি করার জন্য চাইলেও ইঞ্জিনিয়ার সহ কয়েকজন পরামর্শ দের বর্ষায় কাজটি করলে টিকবেনা তাই এখনি কাজটি শুরু করা যাচ্ছে না, তবে বিষটি আমার নজরে আছে। এলাকার মানুষের আকুতি ইট ফেলে হলেও রাস্তাটি  আপাতত চলাচল উপযোগী করে অতি ধ্রুত সংস্কার কাজটি সম্পূর্ন করা হোক ।  এতে করে সাধারন মানুষের দুর্ভোগ অনেকাংশে লাগব হবে।

প্রতিবন্ধীরা সমাজের বোঝা নয়; তাঁরাও দেশের সম্পদ


মনির আহমেদ
শাহাদাত হোসেন। কুমিল্লার মুরাদ নগরে ছেলেটির বাড়ি। জন্ম থেকেই সে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। ছোটকাল থেকেই পড়াশুনায় তার আগ্রহ। এই আগ্রহই তাকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়। প্রতিবন্ধকতা জয় করে জিপিএ ৫ সহ কৃতিত্বের সাথে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করে শাহাদাত।
২০১১ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে একাদশ শ্রেনীতে ভর্তি হওয়ার পর আমার সাথে শাহাদাতের পরিচয়। শাহাদাতের ওরই মতো আরো ক’জন বন্ধু আছে। একদিন তাদেরকে নিয়ে বসলাম।
হাসান নামের একজন বলছিল, ‘মনির ভাই আমরা অনেক বড় হতে চাই। মানুষের মত মানুষ হতে চাই। দেশের জন্য কিছু করতে চাই ,আমাদের কেউ গুরুত্ব দিতে চায় না। আমাদের পরিবারের নিয়মিত সহযোগিতা করার মত কোন অবস্থা নেই। আপনারা যদি আমাদের সহযোগিতা করেন, তাহলে আমরা সাহস হারাবো না। এগিয়ে যেতে পারবো।’
শাহাদাত আরো বললো,  ‘ভাই আমাদের টেপ রেকর্ডার দরকার। টেপ রেকর্ডার হলে শুনে মখস্ত করতে সুবিধা হয়।’
কলেজের ছোট ভাই হাবিবকে একটি টেপ রেকর্ডার কিনে দিতে বললাম। তাদের কথা শুনতে শুনতে  হৃদয়ে আবেগর ঝড় অনুভব করছিলাম। তাদের সবাইকে সহযোগিতার জন্য চেষ্টা করলাম, যদিও প্রয়োজনের তুলনায় সেটা ছিল খুবই সামান্য। শাহাদাত ও হাসান দুজনই এখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের  আইন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। আমি আশা করি তারা আরো ভালো করবে। এই শাহাদাত ও হাসানের মত তরুণেরা সমাজের বোঝা হয়ে থাকতে চায় না, তারা নিজেদেরকে সম্পদে পরিণত করতে চায়। 
এবারের এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল লাভ করে এ কথাই আরো জোর দিয়ে জানান দিল শাহাদাত ও হাসানের  উত্তরসূরী অদম্য মেধাবী প্রতিবন্ধীরা। নিজেদের শারিরিক প্রতিবন্ধকতার কথা ভুলে ওরা যারপরনাই চেষ্টা করেছে মেধার যুদ্ধে টিকে থাকতে। কেউবা অন্যের জমিতে কামলা খেটে পরীক্ষা দিয়েছে, কেউবা পড়ালেখার খরচ জোগাতে চালিয়েছে রিক্সা, আবার কারো বাবা-মা অন্যের ঘরে কাজ করে সন্তানের পরীক্ষার ফি দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন। এভাবে নানা দিক থেকে তারা ছিল সামাজিক সুবিধা বঞ্চিত। অথচ কোন রকম পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ পেয়ে তারাই কিনা সবাইকে তাক লাগিয়ে বাজিমাত করেছে। কেউ পেয়েছে এ প্লাস, কেউ অর্জন করেছে গোল্ডেন এ প্লাসের গৌরব।
আমরা আশা করেছিলাম এসব মেধাবীদের ভরণ-পোষণ বা দেখভালের দায়িত্ব নেবে সরকার। কিন্তু দূর্নীতি-দুঃশাসনে সরকার সবার থেকে এগিয়ে থাকলেও এই অসহায় মানুষের সহযোগিতার ক্ষেত্রে আছে সবচেয়ে পিছিয়ে। দেশের কোটি কোটি টাকা লুট করেও তাদের সামর্থ্য হয়নি কয়েকজন মেধাবী প্রতিবন্ধীর মুখে হাসি ফোটাবার।
এলাকা ভিত্তিক কিছু সামাজিক সংগঠন জিপিএ ৫ প্রাপ্তদের সংবর্ধনা দিলেও অদম্য মেধাবীদের আলাদা করে খবর তেমন কেউ নেননি।
শুধু একটি সংগঠন অদম্য মেধাবিদের জন্য আয়োজন করেছে সংবর্ধনার। এই সংগঠনটি প্রত্রিকায় প্রকাশিত সকল অদম্য মেধাবীকেই সংবর্ধনা দিয়েছে। বিভাগ ভিত্তিক চারটি অনুষ্ঠান করে মোট ১৪৬ জন অদম্য মেধাবীকে ক্রেষ্ট, একাডেমিক বই ও নগদ ৫০০০ টাকা করে সহায়তা প্রধান করে।
এই সংগঠনের নাম বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। অদম্য মেধাবী সংবর্ধনা প্রোগ্রামগুলোয় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুল জাব্বার ও সেক্রেটারী জেনারেল আতিকুর রহমান। উপস্থিত ছাত্ররা যতদিন পড়ালেখা চালিয়ে যেতে চায়, ততদিন ছাত্রশিবির তাদের পাশে থাকবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়।
 রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ আয়োজিত সংবর্ধনায় দৃষ্টি প্রতিবন্ধি সুমাইয়া আক্তার ও মাহমুদা আক্তার এসেছিল নীলফামারী থেকে। সুমাইয়া সংবর্ধনায় বক্তব্য রাখে। সে ছাত্রশিবিরের উদ্যোগরে জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। তার বক্তব্যে এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। এমনিতেই সে অন্ধ। মা নেই, বাবা  বয়োবৃদ্ধ অসুস্থ্য, মাঝে মাঝে রিক্সা চালান। বয়োবৃদ্ধ বাবা যা আয় করেন, তা দিইে চলতে হয়। এমন অনেক দিন গেছে যে না খেয়ে স্কুলে যেতে হয়েছে সুমাইয়াকে। এরপরও পড়াশুনার আগ্রহের জায়গা থেকে সে একচুলও নড়েনি। তার আগ্রহই তাকে জিপিএ ৫ পেতে সহযোগিতা করেছে।
আর একজন মাহমুদা। বাবা নেই, মাকে নিয়ে এসেছিল সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে। ছাত্রশিবিরের কাছে তারা সহযোগিতা চায়। নেতৃবৃন্দ তাদের আশ্বস্ত করেন। জানান, সাধ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করতে ছাত্রশিবির প্রস্তুত ।
আমাকে এ বিষয়ে আরো অনেক তথ্য জানিয়েছেন শিবিরেরর কেন্দ্রীয় স্কুল সম্পাদক মো: শাহীন আহমেদ খান। তাঁর তত্ত্বাবধানেই এই সংবর্ধনাগুলো অনুুষ্ঠিত হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, শিবির সভাপতি এ সকল প্রোগ্রামে সমাজের বিত্তবানদেরএই বলে আহ্বান জানিয়েছেন যেন তারা প্রতিবন্ধীদের সমাজের বোঝা মরে না করে। প্রত্যেকে যেন সাধ্য অনুযায়ী সাহায্যে এগিয়ে আসে এবং এইসব অদম্য মেধাবীদের সুন্দর ভবিষ্যত গঠনে সহযোগিতা করেন ।
ছাত্রশিবিরের এ সকল অনুষ্ঠানে শিবিরের কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের সদস্য ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দরাও মেহমান হিসাবে উপস্থিত থেকে সবসময় ছাত্রদের পাশে থাকার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। অদম্য মেধাবী সংবর্ধনার বিষয়ে শিবির সভাপতির বক্তব্য হলো, ‘এই সংগঠন সবসময় ছাত্রদের কল্যানে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করে। এ ধরণের আয়োজন ছাত্রদের পাশে থাকার একটি অংশ। দেশের সাধারণ মানুষ, সাংবাদিক সমাজ, বিশিষ্টজনরা জানেন আমাদের প্রকাশ্যে কোন কার্যক্রম পরিচালিত করতে দেয়া হচ্ছে না, এমনকি  বিভিন্ন জেলায় আমরা সংবর্ধনা অনুষ্ঠান করতে চেয়েছিলাম তাও আমরা প্রকাশ্যে করতে পারিনি। তবে, প্রশাসন ও সরকার দলীয় নেতা-কর্মীদের শত বাধা, হামলাসহ নানা বাস্তবতার মুখোমুখি হলেও আমরা থেমে যাইনি। আর সব কার্যক্রমের মতো আমরা সংবর্ধনা, সেবা ও কল্যাণমুলক কাজ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। তারই ধারাবাহিকতায় এবারও অদম্য মেধাবীদের সংবর্ধনা দিয়েছি। সাধারণ মেধাবীদের হাতে পুরস্কার তুলে দিয়ে তাদের উৎসাহিত করেছি সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশগঠনে মনোযোগী হতে। তেমনিভাবেক অসহায় প্রতিবন্ধী মেধাবীদের আমাদের সাধ্য অনুযায়ী  আর্থিক অনুদানও দিয়ছি। তাদের পড়া-লেখার যাবতীয় ব্যয়ভারও বহনের ঘোষনা দিয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘আমরা সমাজের মানুষের কাছে দোয়া চাই যেন সকল যুলুম নির্যাতন উপেক্ষা করে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ রাসুল (সঃ) এর আদর্শ বাস্তবায়নে ভুমিকা রাখতে পারি । ছাত্রসমাজসহ সাধারন মানুষের পাশে সবসময় থাকতে পারি।
আমরাও চাই শুধু ছাত্রশিবির নয়, সরকার, সমাজের প্রত্যেক বিত্তবান মানুষ ও সামাজিক সংগঠন প্রত্যেকে নিজের জায়গা থেকে এগিয়ে আসুক অদম্য মেধাবীদের সহযোগিতায়। তাদেরও  এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হোক। তারা দেশের বোঝা নয়, পরিণত হোক সম্পদে। এগিয়ে যাক দেশ এবং জাতির কল্যাণে ভূমিকা রাখার জায়গায়। দূর্নীতি ও শোষন মুক্ত সমাজ গঠনে তারাও ভূমিকা রাখুক, এই প্রত্যাশা আমাদের সবার।
লেখক ঃ সাংবাদিক ও লেখক


লঞ্চ দুর্ঘটনা, হারিয়ে যাওয়া শত লাশের দায়িত্ব কার?
মনির আহমেদ
পৃথিবীতে যাত্রা শুরুর পর থেকেই মানুষের বিভিন্ন বিষয়ে চাহিদা প্রকাশ পেতে থাকে। প্রয়োজনের আলোকে মানুষ আবিষ্কারও করেছে অনেক কিছু। নদী পথে যেমন যাতায়াতের প্রয়োজনে লঞ্চের আবিষ্কার ঘটেছে। লঞ্চ ছাড়াও নৌকা, ট্রলার, ষ্টিমার, স্পিড বোট নদী পথে যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম।
দ্বিতীয় আদম খ্যাত হযরত নুহ (আঃ) এর নৌকা তৈরির মধ্য দিয়েই মানুষের পানি পথে চলাচল করার  চিন্তা যোগ  হয়। একে একে আবিষ্কৃত হয় অনেক বড় বড় যানবাহন। টাইটানিকের নাম আমরা সকলে শুনি। পৃথিবির সবচেয়ে বড় লঞ্চ হিসাবে তৈরি করা হয়েছিল এটি।
নদী পথে যাতায়াতের এতসব আবিষ্কারের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে, প্রায় ৫২ হাজার কোটি বর্গকিলোমিটার আয়তনের পৃথিবীর দুই ভাগই জল, আর এক ভাগ স্থল। বিজ্ঞানীদের মতে, ২৯ ভাগ স্থল আর ৭১ ভাগ জলভাগ। বাংলাদেশ পৃথিবীর একটি ছোট রাষ্ট্র। ১ লক্ষ ৫৬ হাজার বর্গ কিলমিটারের এ দেশের উল্লেখযোগ্য অংশ জলভাগ। যার কারণে বলা হয়- নদী মাতৃক বাংলাদেশ । যার উপর দিয়ে বয়ে গেছে পদ্ধা, মেঘনা, যুমনা, সুরমা, কুশিয়ারা, শীতলক্ষা, বুড়িগঙ্গাসহ অনেক নদী।
সড়ক পথ অতীতের চেয়ে বাড়লেও এখনও রাজধানীর সাথে অনেক জেলার যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম নদীপথ। সুতরাং স্বাভাবিক কারণেই বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের একমাত্র যানবাহন ষ্টিমার, ট্রলার ও লঞ্চ। বাধ্য হয়েই অনেক মানুষের চলাচল করতে হচ্ছে লঞ্চ, ট্রলার বা ষ্টিমারে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রতি বছরই আমরা দেখি, জলপথে দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটছে এবং হারিয়ে যাচ্ছে হাজারো মানুষ। ফলে অসহায় হয়ে যাচ্ছে অনেক পরিবার। একমাত্র উপার্জনোক্ষম পরিবারের কর্তা ব্যক্তিকে হারিয়ে পথে বসতে হচ্ছে হাজারো পরিবারকে।
সর্বশেষ গত কিছুদিন আগে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ঘাটের কাছে পদ্মা নদীতে এম এল পিনাক- ৬ নামের একটি যাত্রিবাহী  লঞ্চ ডুবে যায়। সাথে সাথে সেখানে ছুটে যান নৌমন্ত্রী শাহজাহান খান। সেই লঞ্চে তাঁর তিন ভাগ্নীও ছিলেন বলে পত্রিকায় খবর ছাপিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেত্রীসহ সকল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সমবেধনাও  জানিয়েছেন। ২৫০ থেকে ৩০০ যাত্রী নিয়ে  ছেড়ে আসা পিনাক থেকে লাশ পাওয়া যায় ৩৮-৪২ জনের। দেড়শতাধিক লাশের কোন হদিসই পাওয়া যায়নি। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীরা কয়েকদিন নদীর ধারে কান্নাকাটি করে কোন উপায় না পেয়ে শেষে ফিরে গিয়েছে। হা-হুতাশ আর চোখের পানিই এখন তাদের একমাত্র সম্বল ।
বিআইডব্লিউটির এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ১৯৭১ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত গত ৪৩ বছরে নৌ-দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ১০ হাজার ৩১৬ জন যাত্রীর। এর মধ্যে বড় ধরণের দুর্ঘটনা ঘটেছে শতাধিক। সবচেয়ে বেশী প্রাণহানির ঘটনা ঘটে গত বছর। তিনটি বড় দুর্ঘটনায় গত বছর মৃত্যু হয় এক হাজার ১০৫ জনের। সর্বশেষ ঘটলো মুন্সীগঞ্জের ঘটনা। অভ্যন্তরীণ নৌ-পথে চলাচলকারী শতকরা ৮০ভাগ নৌযানেরই ফিটনেস নেই বলে ওই সমীক্ষা-প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে ।
এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে প্রায় ২০ হাজার। দুইশত মামলা নিষ্পত্তি হলেও দোষীদের কাউকেই শাস্তি দেয়া যায়নি। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত সংঘটিত নৌ-দুর্ঘটনা তদন্তে ৫ শতাধিক কমিটি গঠিত হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র  পাঁচটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও সুপারিশসমূহ বাস্তবায়ন হয়নি। এবারও লঞ্চডুবির ঘটনায় অনুরুপভাবে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনও কম সময়ের মধ্যে দেয়ার কথা রয়েছে। প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখবে কিনা, আবার প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখলেও কতটুকু সুপারিশ বাস্তবায়ন হবে  তাই এখন দেখার বিষয় । বার বার লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটছে, মানুষ মারা যাচ্ছে। কোন বিচারই হচ্ছে না!
দুর্ঘটনার সাথে প্রকৃতপক্ষে কারা জড়িত? কাদের ইচ্ছায় আইনের তোয়াক্কা না করে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই লঞ্চ চলাচল করছে?  যে লঞ্চে ৮০-১০০ জন যাত্রী উঠার কথা ছিল, সেখানে কীভাবে ২৫০-৩০০ যাত্রি  উঠছে? কারা লাভবান হচ্ছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা এখন সময়ের দাবি।
ঈদের পূর্বে ২৪ তারিখে আমি মাওয়া ঘাট হয়ে খুলনা যাচ্ছিলাম।  স্পিডবাটে সাধারণত ভাড়া ১৫০ টাকা। কিন্তু দিতে হলো ২৫০ টাকা। বোটে উঠেই ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম, ১০০ টাকা যে বেশী  দিতে হলো এই টাকা কি বোটের মালিক পায়? তার সোজা উত্তর- না। তাহলে কারা পায় জানতে চাইলে বলে- কতৃপক্ষ। একইভাবে লঞ্চেও ভাড়া দ্বিগুন বা কোন কোন ক্ষেত্রে এর চেয়েও বেশী পরিশোধ করতে হয়েছে যাত্রীদের। প্রশ্ন হলো, কারা এই কতৃপক্ষ? মাঝে মাঝে কানকথা শোনা যায় মন্ত্রী থেকে শুরু করে এলাকার গুরুত্বপূর্ণ দলীয় নেতারাই হচ্ছেন  কর্তৃপক্ষের একেকজন। প্রতিদিন কত দিতে হয় মন্ত্রীসহ নেতৃবৃন্দদের? মাঝে মাঝে টাকার অঙ্কও শোনা যায় বাতাসে। গোমর ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়েই কি কখনো এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়া হবে না?
হাঁ, মাশুল দিতে হবে শুধু জনগণকে। জনগণ এভাবেই একটার পর একটা হত্যাকা-ের বলি হবেন, আর দূর্ভাগ্যকে দোষারোপ করে প্রস্তুত হবেন পরবর্তী  হত্যাকান্ডেকে দুর্ঘটনা বলে মেনে নিতে। কারণ, আমরা বাংলাদেশের জনগণ। এ দেশে সবচেয়ে মূল্যবান সরকারের গদি, আর সবচেয়ে মূল্যহীন মানুষের জীবন।
দিন যত যাচ্ছে জনসেবায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানের মানও বিশ্বব্যাপী তত বাড়ছে। কিন্তু বাংলাদেশে কোথায় উন্নয়ন? কিছু মানুষের চরিত্র আজো অপরিবর্তিত। তারা অর্থের জন্য যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন। পদ্মায় সেতু হওয়ার কথা দিয়েছিল আওয়ামীলীগ সরকার। আমরা আশান্বিত হয়েছিলাম। কিন্তু তা হলো না। মার্কিন দূত ডব্লিউ ড্যান মজিনা বলেছেন, পদ্মাসেতু হলে এই লঞ্চ দুর্ঘটনা এড়ানো যেতো। কিন্তু কেন পদ্ধা সেতু হলো না? এই প্রশ্নের জবাব কে দেবে? তাহলে আমরা কি বলব, শুধু কিছু মানুষের অর্থের চাহিদা পুরণ করতেই বলি দেয়া হচ্ছে হাজারো মানুষকে। আমরা সমাধান চাই। অতি দ্রুতই পদ্মা সেতু হবে, এ অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ লাগব হবে; এই আমাদের প্রত্যাশা। 
লেখক :সাংবাদকি ও লখেক









শত মায়ের আর্তনাদ; দায় এড়ানোর সুযোগ আছে কি?


মনির আহমেদ
‘আমি বাইরের কাচারি ঘরে শুয়েছিলাম। খুব ঘুমও আসছিল। সারাদিনের বিভিন্ন কাজ শেষে ক্লান্ত। রাত তখন আনুমানিক ৩টা। শরীরের পাশে ঠা-া কিছু অনুভব করলাম। ঠা-া জিনিসটার পাশে একজন মানুষের অস্তিত্বও টের পেলাম। একটু সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম- কে? উত্তর এলো-  আমি তোমার বন্ধু। কণ্ঠ শুনে কুদ্দুসকে চিনতে অসুবিধা হয়নি। আমার বাল্য বন্ধু। তার সাথে একটি বন্দুক, ঠা-া জিনিসটা। রাজাকারদের তাড়া খেয়ে কুদ্দুস কোন রকম পালিয়ে এসেছে। রাত ২.৩০টা থেকে আমার পাশে শুয়ে ঘুমানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে ।’
মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলতে গিয়ে কথাগুলো বলছিলেন বাবা। তখন আমি চতুর্থ কি পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ি। জিজ্ঞেস করলাম, বাবা তুমি মুক্তি যুদ্ধে গিয়েছিলে? তাঁর সহজ উত্তর, নারে বাবা আমি যেতে পারিনি। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের অনেক সহযোগিতা করেছিলাম। বাবার কাছ থেকে শুনলাম কেন ও কীভাবে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছিলেন। অনেক কথার ফাঁকে বললেন, অধিকার আদায়ের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র চেয়েছিলাম।
দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য- অধিকার অর্জিত হয়নি। বাংলাদেশের মানুষ আজো বঞ্চিত ভাতের অধিকার থেকে, বঞ্চিত বাঁচার অধিকার থেকে। কোথায় স্বাধীনতা? কোথায় অধিকার? একজন সুস্থ্য মানুষ বাসা থেকে বের হওয়ার পর সে জানে না বাসায় আবার  ফিরতে পারবে কিনা। নিজ বাসায় ঘুমানোর পর জানেনা তার বাসায় সে নিরাপদ কিনা।
এমন কিছু ঘটনার বর্ণনা পড়ছিলাম গত ৩১ আগষ্টের প্রথম আলো, মানবজমিন, সমকালসহ কয়েকটি পত্রিকায়। ব্যস্ততা থাকায় গত ৩০ আগষ্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস ২০১৪ উপলক্ষে মৌলিক অধিকার সুরক্ষা কমিটি আয়োজিত জাতীয় সম্মেলনে যোগ দিতে পারিনি। তাই একটু বেশী মনোযোগী হয়েই পত্রিকা পড়ছিলাম। নিজের অজান্তেই কখন যে চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়া শুরু হয়েছিল বুঝতেই পারিনি। পড়া যত সামনের দিকে এগুচ্ছিল, মন তত ডুকরে কেঁদে উঠছিল। কান্না চাপা দিয়ে রাখতে পারছিলাম না। মানুষ হিসেবে নিজেকে অসহায়, জড় পদার্থ মনে হচ্ছিল। পত্রিকা থেকে পাঠকদের জন্য কিছু অংশ তুলে ধরছি।
‘আমাদের প্রত্যেকটা সকাল হয় অপেক্ষা নিয়ে। এই বুঝি আরিয়ানের বাবার একটা খবর পাব। কিন্তু দিন শেষে কিছুই হয় না। আমরা শুধু ওকে ফেরত চাই।’
মুখে ওড়নাচাপা দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে এসব কথা বলছিলেন শাম্মী সুলতানা। তাঁর স্বামী রাজধানীর ৭৯ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সভাপতি খালিদ হাসান (সোহেল) গত বছরের ২৮ নভেম্বর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটক থেকে নিখোঁজ হন। গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) পরিচয়ে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছে পরিবার।
শাম্মী সুলতানা যখন মঞ্চে বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন তাঁর ছয় বছরের ছেলে সাদমান শিহাব আরিয়ান দর্শক সারিতে ভীড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে বুকের কাছে ধরে আছে বাবার ছবি। ছবিতে আরিয়নের বাবার হাসি হাসি মুখ। কিন্তু আরিয়নের মুখ অন্ধকার, মলিন। শিশুটিকে জিজ্ঞেস করতেই বললো, ছবির লোকটা তার বাবা, যাঁকে আরিয়ান অনেক দিন ধরেই খুঁজে পাচ্ছে না। মা শাম্মী সুলতানার সঙ্গে এই ছবি নিয়ে নয় মাস ধরে বাবাকে খুঁজে ফিরছে আরিয়ান। সম্মেলনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গুম-খুনের শিকার হওয়া ৯৭ পরিবারের মধ্যে ২২ পরিবারের সদস্যরা নিজেদের করুণ কাহিনী তুলে ধরেন। প্রতিটি ঘটনাতেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্পৃক্ততা থাকার অভিযোগ করা হয়। যদিও গুম-খুনের অভিযোগগুলো বরাবরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অস্বীকার করে আসছিলেন।
গত বছরের ২৭শে নভেম্বর রাতে কুমিল্লা থেকে গুম হওয়া সাবেক এমপি ও বিএনপি নেতা সাইফুল ইসলাম হীরুর মেয়ে মাশরুফা ইসলাম বলেন, ‘আমার আব্বু ফ্রিডম ফাইটার ছিল। উনি কি দেশ স্বাধীন করেছে এই জন্য যে, এই দেশে তাকে গুম করা হবে? নয় মাস ধরে আমরা বাবাহারা হয়ে আছি। আমার বাবা হার্ট ও ডায়াবেটিসের রোগী। জানি না তার এখন কী অবস্থা। আমার আব্বুকে মেরে ফেলছে কিনা তাও জানি না। কেস করেছি তারও কোন আপডেট নাই।’
মাশরুফা বলেন, ‘বাবা যেখানেই থাকতো প্রতিদিন হয় আমাকে ফোন দিতো অথবা আমি বাবাকে ফোন দিতাম। নয় মাস চার দিন হলো আমাকে কেউ ফোন দেয় না। বলে না, মা তুমি কী করছো?’ তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তো তার পিতাকে হারিয়েছেন, স্বজন হারিয়েছেন। তিনি স্বজন হারানোর বেদনা বোঝেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুতি জানাই আমার বাবাকে যেন ফিরিয়ে দেয়া হয়।’ বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
 মাশরুফার পিতা সাইফুল ইসলাম হীরুর সঙ্গে গুম হয়েছেন হুমায়ূন কবীর পারভেজ। তার স্ত্রী শাহনাজ আক্তার বলেন, ‘আমি আমার ছেলেমেয়েকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করেছি। ঈদের সময় আমার মেয়ে বলেছে, আমার তো বাবা নেই, আমি একটার বেশি জামা নেবো না। এ কথা শুনে আমি হু হু করে কেঁদেছি। আমার বয়স্ক শ্বশুর-শাশুড়ি আমার কাছে তাদের ছেলের খবর জানতে চান। আমি কোন উত্তর দিতে পারি না।’
শাহনাজ বলেন, ‘আমার স্বামীর কিছু লোন ছিল আমরা তা শোধ করতে পারছি না। স্বামীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কিছু টাকা ছিল তা-ও তুলতে পারছি না। তার স্বাক্ষর ছাড়া ব্যাংক টাকা দেয় না। এখন তাহলে আমরা কোথায় যাবো? কীভাবে বাঁচবো?
তিনি বলেন, ‘নয় মাস ধরে কাঁদছি। এখন আমাদের কান্নাও হারিয়ে গেছে। কাঁদতে কাঁদতে চোখের জল শুকিয়ে গেছে। এখন আর কাঁদতেও পারি না।’
শাহনাজ বলেন, ‘তবু আমি বিশ্বাস করি, আমার স্বামী বেঁচে আছে। সে র‌্যাবের কাছেই আছে। আমার তিন ছেলেমেয়ে এতিম করবেন না।’ প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, ‘উনিও (প্রধানমন্ত্রী) তো আমাদের মতো স্বজনহারা। উনি কি আমাদের মতো স্বজনহারাদের কান্না শুনতে পান না?’
প্রায় সাড়ে চার বছর আগে গুম হওয়া বিএনপি নেতা ও ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলমের মেয়ে মাসুদা আক্তার বলেন, ‘একটা মানুষ মরে যাওয়া স্বাভাবিক। খুন হলেও তার লাশ পাওয়া যায়। কিন্তু বাবাকে সাড়ে চার বছর ধরে গুম করে রাখা হয়েছে। আমার বাবাকে আমি ফেরত চাই।’ তিনি বলেন, ‘বাবা ছাড়া আমরা কেমন আছি, কেউ খোঁজ নেয় না আমাদের। প্রতিবছর ২৫শে জুন আসলে বিএনপির পক্ষ থেকে ফোন করে যেতে বলে। আর কিছু না। এই দেশ কি এভাবেই চলতে থাকবে?’
 ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া ফেরার সময় গুম হওয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আল মুকাদ্দাসের পিতা মাওলানা আবদুল হামিদ বলেন, ‘৩০ মাস ধরে ছেলের জন্য অপেক্ষা করে আছি। কিন্তু ছেলে ফিরে আসে না। আমার স্ত্রী মাঝে মধ্যে স্বপ্ন দেখে- মুকাদ্দাস বাড়িতে এসেছে। সে কান্নাকাটি করে। ছেলের বন্ধুরা আসে। আড়াই বছরের প্রতিটা দিন আমাদের চোখের জল ফেলে কাটাতে হয়েছে।’
‘আমার বাবা একজন চিকিৎসক ছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রেও চিকিৎসকেরা বিশেষ সুবিধা পান। কিন্তু আমার বাবাকে হাত-পা বেঁধে ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে ঠান্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এটা তো কোনো যুদ্ধক্ষেত্র ছিল না। তার পরও কেন এ ঘটনা ঘটল।’ দেশের মানুষের কাছে এ প্রশ্ন রেখেছেন লক্ষ্মীপুরে র‌্যাবের হাতে নিহত চিকিৎসক ফয়েজ আহমেদের মেয়ে উজমা কাওসার।
গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর লক্ষ্মীপুরে র‌্যাবের হাতে নিহত হন জামায়াতের জেলা নায়েবে আমির ফয়েজ আহমেদ। তাঁকে হাত-পা বেঁধে বাসার ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া হয়। পরে নিচে এসে গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। ওই ঘটনার দুদিন পর পরিবারের সব সদস্য লক্ষ্মীপুর ছেড়ে যান। এরপর এক রকম আত্মগোপনে ছিল পরিবারটি। এই প্রথম গণমাধ্যম ও অন্যদের সামনে এসেছেন পরিবারের একজন সদস্য।
উজমা বলেন, ‘লে. কর্নেল তারেক সাঈদের নেতৃত্বে র‌্যাব সদস্যরা তাঁদের বাসায় হামলা চালান। র‌্যাব আসার পর ফয়েজ আহমদ তাঁর ছেলেকে ছাদে পালিয়ে যেতে বলেন। তাঁর ধারণা ছিল, ছেলের ওপর আক্রমণ হতে পারে। তিনি ভেবেছিলেন, র‌্যাব তাঁকে কিছুই করবে না। কিন্তু র‌্যাব  সদস্যরা ভেতরে ঢুকে ফয়েজ আহমেদকে টেনেহিঁচড়ে ছাদে নিয়ে যান। সেখানে তাঁকে প্রচন্ড মারধর করা হয়। আগে থেকেই ছাদের কার্নিশে লুকিয়ে থাকা ছেলে বাবার ওপর নির্যাতনের দৃশ্য দেখতে বাধ্য হয়েছেন।’
উজমা বলেন, ‘আমরা জানি না বাবার অপরাধ কী ছিল। আমাদের কী অপরাধ ছিল? শুধু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জন্যই একটি পরিবারকে এত বড় মাশুল দিতে হচ্ছে!’
তিনি জানান, নিরাপত্তাহীনতার কারণে তাঁরা এখনো লক্ষ্মীপুরে থাকতে পারছেন না। বাবার মরদেহ পাওয়ার বিষয়টিকে সৌভাগ্য হিসেবে মন্তব্য করে উজমা বলেন, ‘দেশে অনেকের স্বজনেরা এখনো গুম হয়ে আছেন। অনেকেই জানেন না তাঁদের স্বজনেরা কী অবস্থায় আছেন, কোথায় আছেন। সে হিসেবে তাঁদের চেয়ে আমরা ভাগ্যবান, অন্তত আমরা আমাদের বাবার মরদেহটা পেয়েছি।’
উজমা বলেন, ‘আর কোনো সন্তানকে যেন চোখের পানি ফেলতে না হয়, কোনো স্ত্রীকে যেন স্বজন হারিয়ে অনিশ্চিত জীবনে যেতে না হয়।’
মঞ্চে তখন রেহানা বানু। বলছিলেন, ‘মা সারাটা দিন দরজার দিকে তাকিয়ে বসে থাকেন। ভাবেন, সেলিম রেজা (পিন্টু) এসে বলবে, আমি এসে গেছি মা! দরজা খোলো।’
ঢাকার পল্লবী থেকে গত বছরের ১১ ডিসেম্বর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে সেলিমকে তুলে নেওয়া হয়। তিনি সূত্রাপুর থানা ছাত্রদলের সভাপতি। রেহান বানু তাঁর বোন।
প্রতিবেদনে এসেছে, রেহানা বানুর বক্তব্য শুনে দর্শকের সারিতে বসা নিলুফার বেগম আর চুপ করে থাকতে পারলেন না। ছেলে তানভীরের জন্য হু হু করে কেঁদে উঠেন।
২০১১ সালে নয়া পল্টন থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে উঠিয়ে নেয়া সাবেক ছাত্র ইউনিয়ন নেতা শামীমের স্ত্রী ঝর্ণা খানম বলেন, ‘রাজনীতি করার জন্যই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। থানায় জিডি করতে গিয়ে হয়রানির শিকার হয়েছি। আমার সন্তানের বয়স এখন দশ বছর। ছেলে জানতে চায় তার বাবাকে মেরে ফেলেছে কিনা? আমি কিছু জবাব দিতে পারি না।’
তিনি বলেন, ‘এসব ঘটনায় রাষ্ট্রের দায়। রাষ্ট্র কর্তৃক অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। প্রতিটি পরিবারের একই দৃশ্য। মা সন্তানের জন্য, স্ত্রী স্বামীর জন্য, বোন ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছে। তারা জানতে পারছে না তাদের স্বজনদের ভাগ্যে আসলে কী হয়েছে।’
এতো ঘটনার পরও আমাদের দেশের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্তা ব্যাক্তিরা মাঝে মাঝে বক্তব্য দেন, এসব কিছু না, দুএকটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটতেই পারে। খোদ সরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামানও  মাওলানা ফারুকী হত্যা ও মগবাজারের ট্রিপল মার্ডার নিয়ে একই বক্তব্য দিয়েছেন, যা পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এতো ঘটনা সরকারের চোখ ফাকি দিয়ে ঘটার কি সুযোগ আছে ? যদি সুযোগ থাকে, তা হলে এই সরকারের কি এ দেশে প্রয়োজন আছে? তারা কি দেশ চালানোর অধিকার রাখে?
আমরা তো এই স্বাধীনতা চাইনি। আমরা তো স্বাধীন দেশে নাক ডেকে বাড়িতে ঘুমাবার নিশ্চয়তা চেয়েছিলাম। চেয়েছিলাম ভাত এবং বেঁচে থাকার অধীকার। আমরা চেয়েছিলাম এ দেশের নিরাপত্তা বাহিনী আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে। গুম অথবা খুনের দায়িত্ব তো তাদের নয়! আমরা তো হানাহানির বাংলাদেশ চাইনি। ক্ষমতার মোহে পারিবারিক, সামাজিক বন্ধন ধ্বংসের বাংলাদেশ চাইনি। আমরা স্বপ্ন দেখেছিলাম হানাদার বাহিনী হাত থেকে মুক্ত হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একটি স্বাধীন, স্বার্বভৌম সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার। যেখানে ভাই ভাইকে তুচছ-তাচ্ছিল্য করবে না। পিতা তার সন্তান ক হত্যা করবে না। ঐশির মত সন্তানরা তার পিতা-মাতাকে হত্যা করবে না। বরং শ্রদ্ধা-ভালবাসা দিয়ে জীবনের শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত আগলে রাখবে। ক্ষমতার জন্য একে ওপরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে না। হায়েনার মত রক্তই শুধু কারো চাহিদা থাকবে না।
আমরা চাই যে সকল হত্যাকান্ড সংঘঠিত হয়েছে, তার সুষ্ঠ বিচার হোক। প্রশাসনের নিকট কোন ব্যাক্তি গুম থাকলে বা প্রশাসনের উদ্ধার করার সুযোগ থাকলে তাদেরকে অতি দ্রুত উদ্ধারের ব্যাবস্থা করা হোক। গুম, খুন, হত্যার রাজনীতি নয়। আমাদের রাজনীতি হোক মানুষের কল্যানে, দেশ ও জাতীর কল্যানে। স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে রাজনীতি নয়, দেশের স¦ার্থে হোক আমাদের রাজনীতি।
লেখক: সাংবাদিক ও  লখেক

ঠেকানো গেল না বিচারপতিদের অভিশংসন বিল


মনির আহমেদ
আইনজীবিরা বিভেদ দূরে ঠেলে ঐক্যবদ্ধভাবে সোচ্চার ছিলেন যেন বিলটি পাশ না হয়। সোচ্চার ছিলেন পেশাজীবিরা, দেশের সচেতন মানুষেরা। কিন্তু কাউকে তোয়াক্কা করেনি বর্তমান আওয়ামী সরকার। কার্যত একদলীয় সংসদে পাশ হলো বিলটি।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধন বিলটি উপস্থিত সাংসদদের ৩২৭ ভোট পেয়ে সর্বসম্মত ভাবে পাস হয়। স্পিকার ড. শিরিন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে দিনের অন্যান্য কার্যসূচি স্থগিত করে বিল পাসের কার্যক্রম শুরু হয়। বিলটি পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী এডভোকেট আনিসুল হক। বিলটির ওপর বিরোধী দলের নেতা বেগম রওশন এরশাদ, জাতীয় পাটির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ, মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বাবলুসহ জাতীয় পার্টি, সরকারের শরীক ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, বিএনএফ এবং স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যসহ মোট ১৫ জন জনমত যাচাই-বাছাই এবং ৩০টি সংশোধনী  প্রস্তাব দেন। প্রস্তাব নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হলেও পরে তা কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়।
বিলের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সদস্যরা বিলের পক্ষে অবস্থান নিলেও তড়িঘড়ি করে গুরত্বপূর্ণ এই বিল পাসের সমালোচনা করেন। তারা সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গে আলোচনা ও জনমত যাচাইয়ের পর বিলটি পাসের দাবি উত্থাপন করেন। নানা ইস্যুতে পার্টির অভ্যন্তরে বিরোধ থাকলেও বিলের ওপর আলোচনায় তারা একই সুরে কথা বলেন। পরে সংসদের লবিতে স্থাপিত বুথে গোপন ব্যালটে বিভক্তি ভোটে বিলটি পাস হয়। প্রায় আড়াই ঘণ্টা আলোচনা শেষে রাত ১০টা ১০ মিনিট থেকে ভোট দেয়া শুরু হয়। ৪০ মিনিটে ভোট দেয়ার কাজ শেষ হয়। পরে ভোট গণনা শেষে স্পিকার ফল ঘোষণা করেন। এ সময় টেবিল চাপড়ে উপস্থিত সংসদ সদস্যরা অভিনন্দন জানান।
এই বিলটি পাস হওয়ায় ১৯৭২ সালের সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ পুনঃস্থাপিত হবে। ওই অনুচ্ছেদে কোন বিচারককে তার বিরুদ্ধে প্রমানিত অসদাচরণ বা অসামর্থ্যরে কারণে সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে অপসারণের বিধান ছিল। তবে এই অনুচ্ছেদে বিচারপতিদের চাকরির বয়স বর্তমান বিধান অনুযায়ী ৬৭ বছর বহাল রাখা হয়েছে।
আমি ১৮ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার প্রত্রিকাগুলো খুব মনোযোগসহ পড়ছিলাম। কারণ এই দিনের পত্রিকাগুলো  ২টি কারনে গুরুত্বপূর্ন ছিল। এক, সংবিধান সংশোধন; দুই, মাওলানা সাঈদীর রায়। অনেকে মনে করেন ষড়োশ সংশোধনী নিয়ে কোন ধরনের আন্দোলন যেন হতে না পারে সেজন্যই মাওলানা সাঈদীর রায়ের দিনটিই তাই বেছে নেয়া হয়েছে। দেখা গিয়েছে, সাইদী সাহেবের রায় পরবর্তী বিক্ষোভ-হরতালে এই বিল পাশ তাই তেমনভাবে প্রচারের আলোয় আসেনি।
গত ৭ সেপ্টেম্বর আইনমন্ত্রী এডভোকেট আনিসুল হক সংসদে বিলটি উত্থাপনের পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সাত দিনের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য ওই দিনই তা আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। শুরু হয় সমাজের বিশিষ্টজন, আইনজীবি, রাজনীতিবিদদের প্রতিবাদ, বিরোধীতা। এই বিরোধীতা অন্যান্য সময়ের মত শুধু একপেশে বিরোধীতা ছিলনা। প্রতিবাদ শুরু করেন আওয়ামী ঘরণার লোকেরাও।
 বিলটি সংসদে উত্থাপনের পর প্রথমেই সাংবাদিকরা সংসদীয় বিরোধীদলের কাছে না গিয়ে রাজনৈতিক বিরোধী দল হিসাবে যারা পরিচিত বিএনপি নেতৃবৃন্দের বক্তব্য সংগ্রহের চেষ্টা করেন। সংসদীয় বিরোধী দলকে দেশের বড় অংশের মানুষ যে গৃহপালিত বিরোধীদল মনে করেন, এটা তাই প্রমান করে। শুধু তাই নয়, স্বয়ং জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হোসাইন মো: এরশাদও ১৭ সেপ্টেম্বর সংসদে কথা বলতে গিয়ে এক পর্যায়ে বলেন, যদি পক্ষে বলি তাহলে তো গৃহপালিত হয়ে যাব। তার বক্তব্য শুনে উপস্থিত সাংসদরা উচ্চ হাসিতে ফেটে পড়েন।
বলছিলাম, সাংবাদিকরা রাজনৈতিক বিরোধী দলের মতামত তুলে ধরেন। বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা বর্তমান ‘অবৈধ’ সংসদের নেই দাবি করে বিলটি পাস হলে আন্দোলন গড়ে তোলার হুমকি দেন বিএনপি নেতারা। পরবর্তিতে ২০ দল দুই দিনের কর্মসূচিও পালন করে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেন, বিচারপতিদের অভিশংসন ক্ষমতা বর্তমান অবৈধ সংসদের নেই। যে সংসদে জনগণের প্রতিনিধি নেই, ১৫৪ জন বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন, সেই সংসদের হাতে বিচারপতিদের অভিশংসন ক্ষমতা দিচ্ছে সরকার। এই ক্ষমতা বর্তমান সংসদের হাতে গেলে জনগণ ন্যায়বিচার পাবে না। শুধু একটি বিশেষ দলের বিচার হবে। তাই বিএনপি অভিশংসন বিলে সমর্থন করবে না। এ বিল পাশ হলে জনগণ তা মেনে নেবে না।
জামায়াত ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারী জেনারেল ডা: শফিকুর রহমানও প্রতিবাদ করে বিবৃতি প্রধান করেন এবং আন্দোলনের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, বাকশাল কায়েমের লক্ষেই সরকার সম্প্রচার নীতিমালার পর বিচারপতিদের অভিসংশন সংসদের হাতে নেয়ার চেষ্টা করছেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান মন্তব্য করেন,  বিচারকদের অপসারণ ক্ষমতা সংসদের হাতে দেয়া হলে দেশে আইনের স্বাধীনতা থাকবে না। তিনি  বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি অসুস্থ্য হয়ে পড়েছে। দেশ গণতন্ত্রশূন্যতায় ভুগছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ব্রিগেডিয়ার (অব.) আ স ম হান্নান শাহ অভিযোগ করেন,  সরকার আইন পরিবর্তন করে বাকশালের দিকে যাচ্ছে। সরকার ধাপে ধাপে বাকশাল কায়েমের লক্ষ্যে একটার পর একটা আইন পরিবর্তন করছে। শেখ মুজিবের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার কাজে হাত দিয়েছেন শেখ হাসিনা। তার পিতার একদলীয় শাসন ব্যবস্থা বাস্তবায়নেই শেখ হাসিনা এখন কাজ করছেন।
তিনি বলেন, সময় আছে জনগণের ভাষা বুঝে সুষ্ঠু নির্বাচন দিন। অন্যথায় আন্দোলনের মাধ্যমে আপনাদের পতন ঘটানো হবে। তখন পালানোর পথ পাবেন না।
বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে শাস্তি দিতেই সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বিল সংসদে উত্থাপনা করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন ।
তিনি বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের সময় আওয়ামী লীগ সভানেত্রীসহ তার দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া সাত হাজার একশটি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। অনেক আসামীকে ছেড়েও দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ লাখ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে দায়ের করা অগণিত মামলার একটিও প্রত্যাহার করা হয়নি। উল্টো মামলা দিয়ে আরো হয়রানি করা হচ্ছে।
পূর্বে ব্যারিস্টার রফিকুল বলেন, বিচার ব্যবস্থা চিরতরে অধীনস্ত করতেই বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা এই একদলীয় সংসদের হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, যে সংসদ জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে গঠিত নয়, যে সংসদে বিরোধী দল নেই, সে সংসদে এই বিল পাস হতে পারে না। পাস হলে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
একইভাবে সমাজের বিশিষ্ট জন, আইজীবীবি ও বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়। ৯ সেপ্টেম্বর ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় একটি সর্বদলীয় কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, খন্দকার মাহবুব হোসেন, ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ, ড. শাহদীন মালিক, সদস্য সচিব হিসেবে ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন ও সহ-সদস্য সচিব হিসেবে সুব্রত চৌধুরীর নাম ঘোষণা করা হয়। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন এ নাম ঘোষণা করেন। তবে ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম এবং ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ পরে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তারা এ কমিটিতে থাকবেন না।
পরদিন বিভিন্ন পত্রিকায় বড় করে সংবাদ ছাপানো হয় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ আইনজীবিরা। কেউ শিরোনাম করেন ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের ডাক আইজীবীদের। কিন্তু আমরা এই বিল নিয়ে সরকারের একরোখা মনোভাব দেখলাম। প্রধানমন্ত্রীপুত্র সজিব ওয়াজেদ জয়ও এই বিষয়ে তার ফেইজবুক পেইজে বিচারপতিদের অভিশংসনের বিলের পক্ষে তার মতামত তুলে ধরেন।
যাচাই-বাছাই শেষে বিলের ওপর সংসদে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সংসদীয় কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। সংসদীয় কমিটি গত ৯ ও ১০ই সেপ্টেম্বর মাত্র দু’টি বৈঠকেই এই প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে।
এর আগে ২০১১ সালের ৩০শে জুন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয়েছিল। বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটে ওই সংশোধনীর মাধ্যমে। সংসদে বিভক্তি ভোটের মাধ্যমে সেদিন বিলটি পাস হয়েছিল। বিলটির পক্ষে  ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছিল ২৯১টি, বিপক্ষে ‘না’ ভোট পড়েছিল মাত্র ১টি। নবম সংসদের একমাত্র স্বতন্ত্র সদস্য মো. ফজলুল আজিম ওই ‘না’ ভোটটি দিয়েছিলেন।
সংবিধানের ষোড়শ সংশোধন বিলটি বাছাই কমিটিতে পাঠিয়ে রিপোর্ট প্রদানের জন্য প্রস্তাব করেন মোট ৮ জন সংসদ সদস্য। এর মধ্যে মো. রস্তুম আলী ফরাজী চলতি বছর ৩০শে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ৫ জন সংসদ সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব করেন। একই প্রস্তাব করেন স্বতন্ত্র তাহজীব আলম সিদ্দিকী, জাতীয় পার্টির এম এ হান্নান, ইয়াহইয়া চৌধুরী ও মো. আবদুল মতিন এবং বিএনএফ’র এসএম আবুল কালাম আজাদ। এছাড়া তিন সদস্যের কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব করেন জাতীয় পার্টির বেগম রওশন আরা মান্নান। আর ছয়জন সংসদ সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব করেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হাজী মো. সেলিম।
বিলটির ওপর জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব করেন বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, জাতীয় পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দীন আহমেদ বাবলু, কাজী ফিরোজ রশীদ, মো. আবদুল মতিন, নুরুল ইসলাম মিলন, পীর ফজলুর রহমান, এম এ মান্নান, বেগম রওশন আরা মান্নান ও ইয়াহইয়া চৌধুরী, জাসদের মইন উদ্দীন খান বাদল, বিএনএফ’র এসএম আবদুল কালাম আজাদ এবং স্বতন্ত্র সদস্য মো. রুস্তম আলী ফরাজী, হাজী মো. সেলিম ও তাহজীব আলম সিদ্দিকী।
সংবিধান (ষোড়শ সংশোধন) বিল-২০১৪ সম্পর্কে স্থায়ী কমিটির রিপোর্টের ১ দফায় সংশোধনী এনেছেন তিনজন সংসদ সদস্য। এদের মধ্যে রুস্তম আলী ফরাজী বিচারপতিদের বয়স ৭০ বছর করার প্রস্তাব করেছেন। এছাড়া হাজী মো. সেলিম ও এম এ হান্নান দফা ১-এর ওপর সংশোধনী আনেন। দফা ২-এর ওপর সংশোধনী এসেছে মোট ২৭টি। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মো. রুস্তম আলী ফরাজী দফা ২ প্রস্তাব করেন, ‘বিচারকদের বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও অসামর্থ্যরে কোন প্রস্তাব সংসদে উত্থাপিত হলে সংসদের নূন্যতম ১০০ জন সদস্যের উক্ত প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন থাকলে প্রস্তাবটি সরাসরি সংসদ কর্তৃক গঠিত জাজেস ইনকোয়ারি কমিশনে প্রেরিত হবে এবং সংসদ উক্ত কমিশনের তদন্ত রিপোর্টের মাধ্যমে প্রমাণিত অসদাচরণ ও অসামর্থ্যের কারণে সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার  দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যা গরিষ্ঠতার দ্বারা সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে প্রদত্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ ব্যতীত কোন বিচারপতিকে অপসারণ করা যাবে না।’
তিনি দফা (২) এর প্রস্তাবিত উপ-দফা (৪) এর পর নতুন উপ-দফা (৫) সন্নিবেশের প্রস্তাব করেন। রুস্তুম আলী ফরাজী তার প্রস্তাবিত ৫ উপ-দফায় বলেন, এই আইনটি কার্যকর হওয়ার পর অনতিবিলম্বে উচ্চ আদালতের বিচারকদের নিয়োগের নীতিমালা তৈরি করার লক্ষে ‘বিচারক নিয়োগ কমিশন’ গঠন করিবেন। এছাড়া ওয়ার্কার্স পার্টির সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা, মোস্তফা লুৎফুল্লাহ, টিপু সুলতান, শেখ হাফিজুর রহমান ও ইয়াসিন আলী এবং নাজমুল হক প্রধান ও শিরীন আখতার বিলের ২ দফায় প্রস্তাবিত উপ-দফা (৩) এর তৃতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘নিয়ন্ত্রণ করিতে পারিবেন’ শব্দাবলীর পরে ‘এবং একই সঙ্গে সংসদ বিচারক নিয়োগের নীতিমালা প্রণয়ন করিতে পারিবেন’ শব্দাবলী সন্নিবেশের প্রস্তাব করেন।
বিলের ওপর আলোচনায় সংসদ সদস্যরা যা বললেন-
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ সংবিধান সংশোধন বিল প্রসঙ্গে সংসদে কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, যদি বলি বিলটি সঠিক তাহলে আমাকে বলা হবো গৃহপালিত। এই সংসদেও রেওয়াজ হয়েছিল যদি ফাইল ছোড়াছুড়ি করতে পারি, তাহলেই সত্যিকারের বিরোধী দল। মানি না, মানবো না, সংসদ বর্জন করি, ওয়াকআউট করি তাহলেই বিরোধী দল!
তিনি আরও বলেন, আমি এই নীতিতে বিশ্বাস করি না। আমি আদর্শের রাজনীতি করি। এই বিলটি পাস হলে স্বাধীন বিচার বিভাগের ওপর হস্তক্ষেপ করা হবে কিনা সেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিচার বিভাগ সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা অনেকের চেয়ে অনেক বেশি। আমার বিরুদ্ধে ৭০টির বেশি মামলা দেয়া হয়েছে। নীতিগতভাবে আমি এই বিলটি সমর্থন করি।
পরে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ বিলটিতে সমর্থন দেয়াতে উপস্থিত সংসদ নেতাসহ সবাই টেবিল চাপড়ে উল্লাস প্রকাশ করেন।
বেগম রওশন এরশাদ বলেন, বিলটিতে আমাদের সমর্থন রয়েছে। তবে এত তাড়াহুড়া করার কোন কারণ ছিল না।
স্বতন্ত্র এমপি হাজী সেলিম সংবিধান সংশোধন বিলটি পাসের আগে বিলটির ওপর জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব করেন। এছাড়া বিএনএফ-এর আবুল কালাম আজাদ বিলটির সমর্থন করলেও একই সঙ্গে বিলটি পাসের আগে জনমত যাচাইয়ের প্র্রস্তাব দেন। জাতীয় পার্টির ইয়াহিয়া চৌধুরী তড়িঘড়ি করে বিলটি পাস না করে সংসদের বাছাই কমিটির মাধ্যমে আরও যাচাই-বাছাইয়ের প্রস্তাব দেন।
জাসদের মাইন উদ্দিন খান বাদল এই বিলটির যারা সমালোচনা করছেন তাদের সমালোচনা করে বলেন, তারা বিরোধিতা করলেও বলছেন না বিলটির কোথায় অসঙ্গতি রয়েছে। তিনি বলেন, জবাবদিহির ঊর্ধ্বে একমাত্র আল্লাহ্। তাই বিলটি জনমত যাচাইয়ে পাঠালেও একই উত্তর ফেরত আসবে।
আইনমন্ত্রী যা বলেন-
আইনমন্ত্রী এডভোকেট আনিসুল হক বিলের সংশোধনী প্রস্তাবের জবাবে বলেন, বঙ্গবন্ধু এই সংবিধান দিয়ে সরকারকে শাসক থেকে সেবকে পরিণত করেছেন। এ নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর কোন সুযোগ নেই। বিচারকদের আরও সুরক্ষিত করতেই সংশোধনী আনা হচ্ছে। তিনি বলেন, আগামী তিন মাসের মধ্যে সংবিধান অনুযায়ী নতুন আইন করা হবে। এতে বিচারকদের অসদাচরণ ও সামর্থ্যেরও ব্যাখ্যা থাকবে।  
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সম্বলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনা ৭ ও ১১ অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং তাদের পক্ষে এই ক্ষমতার প্রয়োগে কেবল সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হবে। এর প্রতিফলনে ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদে সুপ্রিম কোর্টের কোন বিচারককে তার বিরুদ্ধে প্রমাণিত অসদাচরণ বা অসামর্থ্যের কারণে সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার  দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে অপসারণের বিধান ছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে এই পদ্ধতির পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি শাসিত শাসন ব্যবস্থায় সুপ্রিম কোর্টের কোন বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্যের কারণে রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে কোন বিচারককে তার পদ হতে অপসারণ করা যাবে বলে বিধান করা হয়। ওই বিধানে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে, কোন বিচারককে তার সম্পর্কে প্রস্তাবিত ব্যবস্থা গ্রহণের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর যুক্তিসঙ্গত সুযোগ দান না করা পর্যন্ত তাকে অপসারণ করা যাবে না। ১৯৭৭ ও ১৯৭৮ সালের সামরিক ফরমানের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের কোন বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্যের অভিযোগে অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং অপর দু’জন প্রবীণ বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের সুপারিশ সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতির উপর ন্যস্ত করার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যা সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থি। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত সংসদ রাষ্ট্রের অন্যান্য অঙ্গের মতো উচ্চ আদালতের বিচারকদের দায়বদ্ধতা ও স্বচ্ছতার নীতি বিশ্বের বেশির ভাগ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিদ্যমান রয়েছে।
আরও বলা হয়েছে, ‘সংবিধানের বিদ্যমান অনুচ্ছেদ ৯৬ এর দফা ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭ ও ৮ এর পরিবর্তে ১৯৭২ সালের প্রণীত সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের দফা ২, ৩ ও ৪ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদেরকে সংসদের মাধ্যমে অপসারণের বিধান পুনঃপ্রবর্তনের লক্ষ্যে এই বিলটি সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। উক্ত বিলের ৩ দফা অনুযায়ী কোন বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্য সম্পর্কে তদন্ত ও প্রমাণের পদ্ধতি সংসদ আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। সুতরাং ওই আইনে সুনির্দিষ্টকৃত পদ্ধতি অনুসরণে অভিযোগ প্রমানিত না হওয়া পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের কোন বিচারককে অপসারণের সুযোগ থাকবে না। এমতাবস্থায়, বিলটি আইনে পরিণত হইলে স্বচ্ছতা দৃশ্যমান হইবে এবং স্বাধীন বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা আরও বৃদ্ধি পাবে। ফলে বিচারকগণ তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব অবাধ ও সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে পালনের মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সমুন্নত রাখতে পারবেন।’
প্রশ্ন হলো, বিষয়টি যেহেতু এতই গুরুত্বপূর্ণ, তাহলে বিশিষ্ট আইনজীবিদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করে তাদের মতামত নিলে কি খুব সমস্যা তৈরী হতো?  জনমত যাইয়ের পরামর্শ গ্রহন করলে কি খুব সমস্যা হতো? সবই এড়িয়ে যাওয়া হলো। বিদেশী গনমাধ্যমগুলোর মধ্যে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, ইকনোমিষ্টে এ বিষয়ে বক্তব্য এসেছে- প্রধানমন্ত্রীকে একক ক্ষমতাধর বানানোর জন্যই নীতিমালা, আইন করা হচ্ছে ।
১৯৭২ সালে দেশে ফেরার পর শেখ মুজিবুর রহমান সাহেবও বিরোধী পক্ষকে স্বমূলে ধ্বংস করে দিয়ে বাকশাল কায়েমের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন। চারটি ছাড়া সকল পত্রিকা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। সকল সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিলেন এবং সেই নিষিদ্ধের ফাঁদে আওয়ামীলীগও পড়েছিলো। শেষ পর্যন্ত ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারী   বাকশাল কায়েমও করেছিলেন। আওয়ামীলীগ শেখ মুজিবের স্বপ্ন পূরণে ৭২এর সংবিধান ফিরে যাওয়ার কথা বলছেন, অথচ শেখ মুজিবের সর্বশেষ স্বপ্ন ৭২এর সংবিধান ছিল না, ছিল বাকশাল। আসলে আওয়ামীলীগ ভিতরে ভিতরে বাকশালের স্বপ্ন দেখছেন বলে সচেতন মানুষ মনে করেন।
এখন তো আর কথা বলার সুযোগ নাই। কারণ কথা বললে সংবিধানের বিরুদ্ধে বলা হবে। হতে পারে মামলা, হয়রানি, জেল। তাই মনে হয় আন্দোলন ঘোষণাকারীরাও সবাই ইতিমধ্যে চুপসে যাওয়ার নীতি অবলম্বন করেতে শুরু করেছেন। যাদের হাতে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের মত গুরু দায়িত্ব ছিল, তারাও শেষ পর্যন্ত উপেক্ষিত হলো। উপেক্ষিত হলো জাতি, উপেক্ষিত হলো জনতা। বিজয় হলো সরকারের। বাংলাদেশে যে ভাবে সংশোধন আর পরিবর্তনের রাজনীতি শুরু হয়েছে , তাতে এখন দেখার অপেক্ষা এই বিল কতদিন টিকে থাকে ।
লেখক: সাংবাদিক ও লেখক